অজানা ঝর্ণার খোঁজে মেঘালয় ভ্রমণ

আজকের দিনের শুরুটাও বেশ ভালো ভাবেই হয়েছিল আমাদের। দিনের যাত্রাটা শুরু করলাম আমরা পরিচিত ক্রাং সুরিকে দিয়ে। দ্বিতীয়বারের মতো আসা হল এখানে। ভরা বর্ষার মৌসুমের তীব্র তর্জন-গর্জনের ক্রাংসুরিকে দেখেছিলাম গতবার। তবে এবারের রুপ আর আগেরবারের রুপ সর্ম্পূণ ভিন্ন। গুগোলের বিভিন্ন ছবিতে দেখা ক্রাংসুরির যে রুপের টানে এখানে আসা তারই দেখা মিলল এবার। ম্রিয়মাণ গতিতে ধাবিত ক্রাংসুরির নীলাভ রূপ !!!!

ক্রাংসুরির নীলাভ শান্ত রুপের দর্শন শেষ করে আমরা রওনা হলাম আমদের দ্বিতীয় গন্তব্য রিনজি ঝর্ণার উদ্দেশ্যে। রিনজি ঝর্ণায় যাওয়ার শেষ ৫ কিঃমিঃ রাস্তা ভাঙ্গা থাকায় আমাদের নেমে পরতে হয় ট্যাক্সি (৪ সিটের) থেকে। আশেপাশে লোকালয় কম থাকায় আশ্রয় নিতে হয় জিপিএসের। কিন্তু জিপিএসের পথ অনুসরন করে আমরা চলে যাই ভুল পথে (হয়তো)। তবে ভুল পথ অনুসরণ করাতে আমাদের জন্য বেশ ভালোই হয়েছিল। কেননা পথিমধ্যে আমরা দেখা পেয়েছিলাম দুটো নাম না জানা ঝর্ণার, যেগুলো সত্যি বেশ সুন্দর ছিল। অজানা পথে হাঁটতে হাঁটতে দুপুরের যখন শেষ প্রান্তে তখনও জিপিএসের হিসাবে গন্তব্য ৪.৫ কিঃমিঃ বাকি, শুরুতে যেটা দেখাচ্ছিল ৫ কিঃমিঃ। এতো সময় হাঁটার পরেও জিপিএসের দূরত্ব সন্দেহ সৃষ্টি করল সবার মনে। তাই মানে মানেই আমরা ধরলাম ফেরার পথ কেননা আজকের লিস্টের সবচেয়ে বড় ট্রেইলটাই এখনও বাকি। গাড়িতে করে তখন আমরা চলে আসি ডাউকি-জোয়াই রাস্তার পার্শ্ববর্তী থলু আমউই ঝর্ণার সামনে। থলু আমুই ঝর্ণা দেখা শেষে চিপস আর বিস্কুট দুপুরের খাবার হিসাবে পেটে চালান দিয়ে আমরা নেমে পরলাম আমাদের আজকের প্রধান ট্রেইলে।

ফে ফে ঝর্ণায় যাওয়ার এই ট্রেইলটা অসম্ভব রকম সুন্দর। শুরুতে কয়লা খনির পাশ দিয়ে এগোলেও এই ট্রেইলের বেশির ভাগই ঝিরিপথের পাশ দিয়ে, যে ঝিরিটা এসেছে থলু আমুই থেকে। প্রায় আধ ঘন্টা ট্রেক করে আমরা চলে আসলাম ঝর্ণার প্রথম স্টেপে। প্রথম স্টেপ থেকে ঝর্ণায় দুটি পানির ফোয়ারা আলাদা ভাবে বয়ে যাচ্ছে, কিছুটা দূরে সম্মিলিত হয়ে পতিত হচ্ছে দ্বিতীয় স্টেপের মূল ধারা হিসাবে। প্রথম স্টেপ থেকে দ্বিতীয় (মুল) স্টেপে সরাসরি যাওয়ার রাস্তা দেখতে না পাওয়ায় আবার উপরে উঠে কিছুটা পথ পিছিয়ে ঝিরি পাড় হয়ে এগোতে হয়েছিল সামনের পাহাড়ে। ফে ফে ঝর্ণার আসল রূপ দেখার জন্য পাহাড়ি রাস্তায় আরও কিছুটা এগিয়ে যাওয়ার পর ডাউন ট্রেইলে হাটা শুরু করলাম আমরা। এই ডাউন ট্রেইলটা শীতকালে তেমন কঠিন না হলেও বর্ষায় ভয়ংকর হয়ে যাওয়ার কথা। ট্রেইলের মাঝামাঝি থেকেই দেখা পাওয়া যায় ভয়ংকর গাড় নীল আধারে ঝাঁপিয়ে পরা ফে ফে ঝর্ণার অপার্থিব সৌন্দর্যের। ঝর্ণার কাছাকাছি এসে নিজেকে মনে হচ্ছিল নিতান্তই ক্ষুদ্র, অসহায় এক সত্তা।

মনে মনে বলছিলাম কি অসাধারণ সৃষ্টি বিধাতার !!! ফে ফে ঝর্ণার কাছাকাছি যাওয়ার পর পুরো শরীর জুড়ে ভর করলো রাজ্যের ক্লান্তি। পাথরের উপর গা এলিয়ে আরাম করে শুয়ে ঝর্ণার শব্দ শুনেছিলাম বেশ কিছুক্ষন। ফেরার পথ ধরতে ধরতেই পশ্চিম আকাশে সূর্য হেলে পড়লো। গাড়িতে উঠে আমরা যখন পরবর্তী করণীয় ঠিক করছি ততোক্ষণে চারপাশ ডুবে গেছে আঁধারের চাদরে। প্ল্যান অনুযায়ী, আজ বাংলাদেশে ফিরে যাবার কথা থাকলেও সবার সম্মতিতে আরেকটা রাতের জন্য আমরা ফিরে যাচ্ছি পছন্দের গ্রাম সোনাংপেডাং-এ। রাতের অন্ধকার ভেদ করে আকাশের বুকে ছায়ার মত ঝুলে থাকা মেঘালয়ের পাহাড়গুলোকে দেখা যাচ্ছে আবছাভাবে। গাড়িতে চালানো অজানা ভাষার গানের লিরিক্সে ডুবে থেকে এরকম দৃশ্য দেখতে বেশ ভালোই লাগছিল। তবে একটু খারাপ লাগছিল এই ভেবে যে, অপার এই সৌন্দর্য ফেলে কাল ফিরে যেতে হবে ব্যস্ততার জীবনে। তবে এই ফিরে যাওয়াটাও যেন বার বার ফিরে আসার প্রত্যয়ে……………….

***দ্রঃ আমাদের ট্যুরের দুদিনের হিসাব অনুযায়ী খরচ পরেছে ২৫০০ টাকা। কোন খাতে কেমন খরচ কিংবা পুরো ট্যুরটাই কিভাবে নিজেদের সুবিধামত সাজানো যায় তার ধারণা পেতে পারেন আমাদের অভিজ্ঞতার আলোকে তৈরি ডকুমেন্টারি থেকে (লিঙ্ক কমেন্টে দেয়া হল)। তবে এটুকু মাথায় রাখুন, মনে ইচ্ছা আর হাতে ১৫০০ টাকা থাকলেই মেঘালয় দর্শনের শখ পূরণ করা সম্ভব কিভাবে তার বর্ণনা না হয় অন্য কোন একসময়ে দেয়া যাবে।

Source: Saiful Islam‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment

Shares
error: Content is protected !! --vromonkari.com