অভিজ্ঞতা-কুকরি মুকরি

সকাল ৯ টা। কুকরি ঘাট। আমরা সাতজন অপেক্ষা করতেছি নৌকার জন্যে। আগের দিন রাতেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে আমাদের কে ৯ টায় ঘাট থেকে তুলে নিবে। উদ্দেশ্য ছিল সোনার চর, শিপ চর ঘুরে আসব আর সময় হলে ঢাল চরের তাড়ুয়া বিচ। মাঝি আসতে আসতে ১০ টা বাজল। পড়ে বুঝলাম মাঝি আমাদের বাজারের ঘাটে থাকতে বলেছিল কিন্তু আমরা অন্য ঘাটে চলে গেছিলাম। এর জন্যে আমরা ১ ঘন্টা দেরিতে যাত্রা শুরু করলাম।
১ ঘন্টা ইঞ্জিনের নৌকায় মজা করতে করতে যাওয়ার পর আমরা কুকরির শেষ মাথায় চলে আসলাম। এখন সমুদ্র পারি দিতে হবে( এই সাইডের সমুদ্রে নিচে চর থাকার জন্যে একটু শান্ত। উত্তাল না অনেক)। মাঝি প্রপেলার ও ইঞ্জিন চেক করে রওনা দিলেন। সকাল ১১ টা। প্রায় ২ ঘন্টা চলার পর ১ টার দিকে আমরা সোনার চরে পৌছালাম। কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি, সমুদ্রের পানিতে ভিজে, ফুটবল খেলে আমরা ১:৩০ এর দিকে শিপ চরের দিকে যাত্রা করলাম।
শিপ চরের অবস্থান গুগল ম্যাপে দেয়া নাই। দ্বীপের আশে পাশে কোথাও অনেক বছর আগে একটা জাহাজ ডুবে যায়। সেই থেকে শিপ চর নাম। কুকরির শেষ প্রান্ত থেকে শিপ চর প্রায় ১২-১৩ কিমি সমুদ্র দুরত্বে হবে। ২ টার কিছু পরে আমরা শিপ চরে পৌছালাম। ছোট একটা চর। চরের মাঝ থাকে চারপাশের সমুদ্র দেখা যায়। বন যা আছে সমুদ্র ভেংগে নিয়ে গেছে। কিছুক্ষন চরে থেকে প্রায় ৩ টার দিকে আমরা কুকরি রওনা দিলাম কারন পৌছাতে প্রায় ২:৩০ ঘন্টা লাগবে দেরি করলে সন্ধ্যার আগে পৌছাতে পারব না।
রওনা দেয়ার পর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। প্রায় ১:৩০ ঘন্টা চলানোর পর মাঝি একটু পর পর উকি ঝুকি দিয়ে চারপাশ দেখতেছিল। কিন্তূ আশে পাশে সমুদ্র ছাড়া কিছু ছিল না। মাঝির চেহারায় চিন্তা ফুটে উঠে। কিছুক্ষণ পর সিয়াম ব্যাপারটা খেয়াল করে। ও জিপিস অন করে দেখে আমারা শিপ চর থেকে প্রায় ১৫ কিমি সমুদ্রের গভীরে চলে এসেছি অর্থাৎ কুকরি থেকে প্রায় ২৫-৩০ কিমি সমুদ্রের গভিরে। তখন ৫ টা। আর একটু পরে সন্ধ্যা হবে। এবং আমরা পথ হারিয়েছি।
সিয়াম আমাকে ঘুম থেকে তুলে সব বলল। এরকম বিপদে আমার একটু মাথা ঠান্ডা থাকে। আমি জিপিএস অন করে কুকরির ডিরেকশন সেট করলাম। মাঝিকে খুব হতাশ মনে হচ্ছিল এবং সে ভয় পাচ্ছিল কারন সে কোন দিকে যাবে বুঝতেছিল না। আমি মাঝিকে বললাম কোন দিকে যেতে হবে। কিন্তু টেকনোলজি সম্পর্কে ধারনা না থাকার কারনে সে আমাদের কথায় বিশ্বাস পাচ্ছিল না। অনেক দূরে একটা মাছ ধরা নৌকা দেখা যাচ্ছিল সে ওই নৌকার কাছে যেতে লাগল। নৌকার কিছুটা আগে এসে।আমরা ডুব চরে আটকা পরলাম। সবাই নেমে নৌকা ঠেলে ঠেলে নিলাম। এবং জীবনের প্রথমবার মাঝ সমুদ্রে নৌকা ঠেলার অভিজ্ঞতা হল। পরে ওই মাঝির সাথে আমাদের মাঝি কথা বলে বুঝল আমরা যা বলতেছিলাম সেটাই সঠিক। তখন আমাদের উপর আস্থা আসল। আরেকটা সমস্যা হল তেল সমস্যা। কারন মাঝ পথে যদি তেল শেষ হয়ে যায় তবে আমাদের সারা রাত সমুদ্রে ভাসতে হবে। হয়ত রেসকিউ টিমেএ অপেক্ষা করতে হবে। কি পরিমান দুরত্বে আসছি বুঝাই বলার মাঝি নিশ্চিত হল যে তেলে হয়ে যাবে। প্রায় ৫:৪০ এর দিকে আমারা আবার কুক্রির দিকে রওনা দিলাম। আমি জিপিএস নিয়ে বসে ডিরেকশন দিতে লাগলাম আর মাঝি অনেক স্পিডে নৌকা চালাতে লাগল। ১৫ মিনিটের মাঝে সুর্য ডুবে গিয়ে অন্ধকার হতে লাগল। সুধু মনে মনে ভাবতে লাগলাম অন্ধকারে যেন কোন ডুব চরে আটকা না পরি। প্রায় ২ ঘন্টা নৌকা চালানোর পর আমরা অন্ধকারে কুকরির অবয়েব দেখতে পেলাম। সবার মুখ থেকে চিন্তাটা দূর হল। প্রায় ৯:৩০ -১০:০০ টার দিকে আমরা কুকরি বাজারে পৌছালাম। এবং ঘণ্টাখানেক এর মধ্যে খেয়ে দেয়ে বার-বি-কিঊ এর সরঞ্জাম রেডি করে নারিকেল চরের দিকে রওনা করলাম রাতে ক্যাম্পিং করব বলে। মাঝে কোন এক সময় মাঝিকে কাওকে বলতে শুনলাম
“ভুল পথে চলে গেসিলাম। ভাইয়েরা মোবাইল দেখে দেখে নিয়ে আসছে ”

Post Copied From:

Share:

Leave a Comment

Shares
error: Content is protected !! --vromonkari.com