আসাম-ত্রিপুরার রেল পথ ভ্রমণ

একটা ব্যাপার আমাকে খুব খুব অবাক করেছে আর সেটা হল আসাম-ত্রিপুরার মাঝে অবস্থিত এতো এতো অপূর্ব একটা রেলপথ যে আছে সেটা নিয়ে কখনো, কোথাও কিছু বলতে শুনিনি বা লেখা পাইনি। আর এই অদ্ভুত সুন্দর, মন ভালো করে দেয়া মুগ্ধ পথ নিয়ে কোথাও কোন রকম প্রচারণাও দেখিনি বা আমার চোখে পড়েনি। ব্যাপারটা আমার কাছে খুব খুব বিস্ময়কর লেগেছে, ভীষণ অবাক হয়েছি আর একা একাই ভেবেছি যে এমন কেন হল?

ভারতের যেসব রেলপথ নিয়ে নানা রকম প্রচার প্রচারণা আছে, যেমন শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং, কালকা থেকে শিমলা, উটি থেকে মেটটোপেললাম, মুম্বাই থেকে পুনে, শ্রীনগর থেকে বানিহাল, কন্যাকুমারী থেকে চেন্নাই, কন্যাকুমারী থেকে রামেশরম, ভুবেনেশর থেকে বহরমপুরসহ নানা যায়গার চমৎকার সব রেলপথ, পথের দুই পাশের অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক রুপ, সবুজের সমারোহ, নানা রকম চোখ জুড়ানো পৃথিবীর অপূর্ব রুপের কথা বলা হয়েছে। এইসব প্রকৃতির চেয়ে কোথাও কোন অংশে, কম অপূর্ব, অদ্ভুত আর অসাধারণ প্রাকৃতিক রুপের কোন কমতি আমি দেখিনি এই পথে।
অথচ এই অদ্ভুত সুন্দর রেলপথ বা এই পথের রুপ বৈচিত্র নিয়ে কেন যে কোনদিন কিছু বলতে বা লিখতে দেখলাম না, ব্যাপারটা খুব খুব ভাবিয়েছে আমাকে। এই কারনে আরো বেশি অবাক লেগেছে যে এই পথের ট্রেন ভ্রমণের অসম্ভব সুখ পাওয়ার আগে আমি এর আগে ভারতের অন্যান্য বেশ কয়েকটি উল্লেখিত রেলপথে ট্রেন ভ্রমনের অভিজ্ঞতা আর সাদ নিয়েছি, পেয়েছি, দেখেছি আর নিজের মত করে উপভোগ করেছি।

যে কারনে অন্যান্য পথের সাথে এই পথের এতো এতো মিল পেয়ে, দেখে বরং বলা যায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্যান্য অনেক পথের চেয়েও অনেক বেশি মনোমুগ্ধকর, অপূর্ব আর অদ্ভুত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই রেলপথ। অথচ এই পথের কথা আগে কোনদিন জানতেই পারিনি, শুনিনি বা কোন রকম প্রচারনা চোখে পড়েনি।অথচ কি নেই এই রেলপথের দুইপাশে? পাহাড়, গভীর অরণ্য, নদী, সবুজের ছড়াছড়ি, পাহাড়ি ছড়া, বিশাল বিশাল পাহাড়ে কে ভেদ করে যাওয়া টানেল, গা ছমছমে বনের অন্ধকার, কাছেদুরে নীল পাহাড়ের হাতছানি, পাহাড় শ্রেণীর অদ্ভুত আহবান, কি নেই? অথচ তারপরেও এই পথ নিয়ে কোন কিছু পাইনি বা শুনিনি কোথাও। আর এই পথের মাঝের যে রেলওয়ে স্টেশন গুলো, সেগুলো? প্রতিটি স্টেশন যেন এক একটা স্বর্গের ঠিকানা! প্রতিটি স্টেশন এক একটি আনন্দে অভিভূত হয়ে যাওয়ার মত যায়গা।

আমি আগরতলা থেকে আসাম বা শিলচর অবদি যাইনি। আমি প্রায় অর্ধেক পথ, পানিসাগর থেকে আগরতলা অবদি গিয়েছি। তাতেই আমি এতো এতো বেশি মুগ্ধ হয়েছি যে বলে বা লিখে বোঝানোর মত নয় আদৌ। চারদিকে ঘন সবুজ অরণ্যে আচ্ছাদিত প্রতিটি রেলওয়ে স্টেশন নানা রকম রঙে রেঙে বর্ণীল হয়ে আছে। ঝকঝকে, তকতকে আর পাহাড়ি ঝিরঝিরে বাতাসে প্রান পাগল করে তোলে। এতো এতো চমৎকার এক একটি স্টেশন যে অনায়াসে এসব স্টেশন এর যে কোনটায় ক্যাম্পিং করা যায় নিশ্চিন্তে।

কোন কোন স্টেশন তো একেবারে বনের গভীরে ঢুকে গিয়েছে তার প্লাটফর্ম এর শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে। কোন কোন স্টেশন আদিবাসী মানুষের পাড়া গা গ্রাম সংলগ্ন। কোন কোন স্টেশন বিশাল টানেলর শেষে ঢুকে গেছে প্রায়। অদ্ভুত একটা শিহরণে শিহরিত হতে হয় কখনো কখনো। এই পথের স্টেশন গুলোর আর একটা বিশেষ ব্যাপার হল, শুধুমাত্র ট্রেন যাওয়া আসার সময় বসা আদিবাসী বাজারে নানা রকম পাহাড়ি গ্রামের সবজি, ফল-মূল আর নানা রকম দ্রব্যের পসরা সাজিয়ে বসা। খুবই কম দামে কিনতে পারা যায় নানা রকম সবজি, ফলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক কিছু।

আর এই পথে ট্রেন যখন বাঁক নেয়, তখন তো মনে হয় ট্রেন যেন তার পথ হারিয়ে গভীর অরণ্যের ভিতরে ঢুকে পরছে বুঝি। মাঝে মাঝে তো ভয়ই লাগে, এই ট্রেন বুঝি বনের মাঝে হারিয়ে গেল! এতোটাই গভীর, এতেটাই ঘন আর এতোটাই অরণ্যে আচ্ছাদিত এই পথ। প্রায় পুরোটা পথ বাইরের ঘন সবুজ অরণ্যে তাকিয়ে, কাছেদুরে পাহাড় দেখে, পাহাড় আর অরণ্যর ঝিরঝিরে বাতাস গায়ে মেখে, নানা রকম বাঁকে, টানেলে, আধারে, রোমাঞ্চিত হতে হতে, হয়তো নাকে পেয়ে যেতে পারেন ধোয়া ওঠা গরম কফির মাদকতাময় গন্ধ।

যা আপনার চেতনাকে নিয়ে যাবে ভিন্ন কোন জগতে, মনে মনে ভাববেন, এমন গভীর অরণ্যে, গা ছমছমে ট্রেন চলার পথে, আলো-আধারিতে আপনি বোধয় একটু বিলাসী স্বপ্নে, একটু অলীক ভাবনায় নিজেকে হারিয়ে ফেলেছেন। এখানে এমন চনমচনে কফির মাদকতাময় গন্ধ আসবে কোথা থেকে?কিন্তু না, আপনি তো মুগ্ধ নয়নে, মনপ্রান দিয়ে তাকিয়ে ছিলেন বাইরের অদ্ভুত সুন্দর পাহাড়, জংগল আর সবুজের মাঝে। আপনার মন তো বাধা পড়ে ছিল দুই পাশের অপরূপ প্রকৃতির মাঝে। তাই খেয়াল করেননি, কোন এক পাহাড়ি স্টেশন থেকে গরম কফির বিশাল কেটলি বা ফ্লাক্স নিয়ে উঠেছিল কেউ। হেটে হেটে সেই কফি বিক্রি করছে ট্রেন এর কামরায়। সম্বিৎ ফিরে পেতেই চেয়ে নিলেন এক পেয়ালা গরম, ধোয়া ওঠা, মদকতার গন্ধ ছড়ানো উষ্ণ কফি।
আহ, সেই সময়ের অনুভুতি কি হতে পারে, কেমন হতে পারে? কতটা অভিভুত হতে পারে কেউ এমন সময়ে। যারা ভালোবাসে, পাহাড়, অরণ্য, ঘন কালো মেঘ, শ্রাবণ ধারা, অন্ধকার, ট্রেন এর ঝিকঝিক শব্দ, ছুটে চলা ট্রেন এর মায়াবী দোলা, খোলা জানালা দিয়ে ছুঁয়ে যাওয়া ঝিরঝিরে বাতাস, দুই এক ফোঁটা শ্রাবণ ধারা আর গরম কফির মাদকতায় ঠোঁট ছোয়ানোর বিলাসিতা…
আমার জানা নেই। আমি শুধু জানি, এমন অপার্থিব সবকিছু একই সাথে পেয়ে, আমি হয়ে পড়েছিলাম বিমোহিত, তাকিয়ে ছিলাম অপলক, মুগ্ধ নয়নে উপভোগ করছিলাম বাইরের প্রকৃতি, দুলছিলাম ট্রেন এর দোলায়, ট্রেন এর জানালা থেকে হাতে নিয়ে গরম কফির আদুরে পেয়ালা….

পরিবেশ আমাদের পরিবারের মতন, তাই আসুন এঁকে নিজের পরিবারের মতই পরিচ্ছন্ন রাখি।
Source: Sajol ZahidTravelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment

Shares