জাফলং, লালাখাল, শাহপরান মাজার

সিলেট ঘুরতে গিয়েছেন কিন্তু জাফলং যাননি তাহলে আপনার ঘুরতে যাওয়াটাই বিফল হয়ে যাবে। সিলেট থেকে জাফলং যেতে দুই ঘণ্টার একটু বেশি সময় লাগে।কিছুটা রাস্তা বেশ খারাপ কিন্তু বিছানাকান্দির মতো অত খারাপ না। সিলেট থেকে জাফলং, লালাখাল এবং শাহ পরানের মাজার সহ সারাদিনের জন্য সিএনজি ঠিক করলাম। লোকাল সিএনজি চালকরা একটু দুষ্টু প্রকৃতির। আপনার কাছ থেকে কত টাকা হাতিয়ে নেওয়া যায় এই ধান্দায় থাকে। তিন, চারটা সিএনজি সাথে কথা বলার পরে ১৫০০ টাকায় একজনকে রাজি করালাম। লোকটা বেশ ভালোই ছিলো, বেশ ভালো ভাবে সিএনজিটা চালাচ্ছিল। হোটেলে সকালের কম্প্লিমেন্টারি নাস্তাটা সেরে ঠিক ৮ সময় সিএনজি নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। পথে কিছু কলা কেনার ইচ্ছা ছিল কিন্তু কোন দোকানেই কলা পাচ্ছিলাম না। অবশেষে একটি দোকানে অল্প কিছু কলা পেলাম। আনুমানিক 2 ঘণ্টা 20 মিনিট পরে জাফলং পৌছালাম। 3 থেকে 4 কিলোমিটার রাস্তা একটু খারাপ ছিল। যতই জাফলং এর কাছে যাচ্ছি ততই দূর থেকে মেঘালয়ের পাহাড় গুলো দেখে মনে হচ্ছিল জীবন্ত কোনো স্বর্গ। পাহাড়ের এক পাস হচ্ছে বাংলাদেশ অন্য পাস ইন্ডিয়া। সিএনজি স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালো। একটু হেঁটে সামনে যেতেই দেখি ছবির মত সুন্দর প্রকৃতির দৃশ্য। দুই পাশে পাহাড় তার মাঝখান থেকে বয়ে চলা নদী। উপর থেকে সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে কখনো ভাবিনি আরো বড় চমক অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।

বাস স্ট্যান্ডের উপর থেকে খুব আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নিচের দিকে নামতে হবে। নামা খুবই সহজ কিন্তু ওঠাটা খুবই কঠিন। একটু এদিক সেদিক হলে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। নিচে নামার পরে আবিষ্কার করলাম সেখানে একটা বড় সিন্ডিকেট আছে। আমি নিচে নেমে চুপচাপ বোঝার চেষ্টা করলাম কি হচ্ছে এখানে।জাফলং টা ঘুরে দেখার জন্য আপনাকে নৌকা অথবা ট্রলারে যেতে হবে। ট্রলারের থেকে নৌকায় ঘুরতে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ। নৌকায় করে ঘুরতে যে উপভোগ আপনি করতে পারবেন ট্রলারে সেটা পারবেন না। মূল ঘাটে সবাই সিন্ডিকেট হয়ে জড়ো হয়ে বসে আছে। ঘুরতে হলে ওখানে ওরা জিজ্ঞেস করবে আপনি কি প্যাকেজে যাবেন নাকি প্যাকেজ ছাড়া। প্যাকেজে যাওয়াটা অত্যন্ত বোকামি। প্যাকেজে অতিরিক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত চা বাগান এবং সুপারি বাগান। আমি মনে করি সিলেটের চা বাগান এবং সুপারি বাগান দেখতে চাওয়াটাই বোকামি। চা বাগানের সৌন্দর্য শ্রীমঙ্গল ছাড়া আর কোথাও খুব একটা পাওয়া যায় না। জাফলং যদি ওই দুইটা স্পোর্ট দেখতে চান তাহলে ওরা ১৮০০ থেকে ২৫০০ টাকা দাবি করবে।

আমি 600 টাকায় নৌকা ঠিক করলাম পুরো জাফলং ঘুরিয়ে দেখার জন্য সাথে অতিরিক্ত হিসেবে পায়ে হেঁটে নতুন খাসিয়া পল্লী নিয়ে যাবে। নৌকায় 10 মিনিট যাওয়ার পর নৌকা থেকে নামলাম, 10 মিনিট পায়ে হেঁটে নতুন খাসিয়া পল্লী পৌছালাম। খাসিয়া পল্লী জীবন ধারাটা বেশ গোছালো এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। পল্লীর ভিতরে তাদের রাজার একটি বাড়ি আছে বাড়ির সামনে যেতেই বিদেশী প্রজাতির একটি কুকুর ডাক দিয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানালো। ভয় পেয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। খাসিয়া পল্লীর সব থেকে মজার হচ্ছে প্রতিটি বাড়িতে অসংখ্য পাহাড়ি টিয়া পাখি আছে। পাখিগুলো উন্মুক্ত থাকে সম্ভবত পোষ মানানো, উড়ে যায় না। 10 মিনিট ঘোরাঘুরি করে আবার নৌকায় ফিরে আসলাম। নদীটা পার হয়ে বালির মরুভূমির উপর দিয়ে পায়ে হেঁটে পাথরে ঝর্ণার কাছে গেলাম। বৃষ্টির সময় এটি একটি পরিপূর্ণ ঝর্ণায় পরিণত হয়।আমরা পাথর বেয়ে অনেক উপরে উঠলাম অল্প কিছু পানি বেয়ে পড়তে ছিল। বুঝতে বাকি রইল না বর্ষা সময় ঝর্নাটা কতটা চমৎকার হয়।

খালি পায়ে বালির উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া খুবই কষ্টকর, মনে হয় পায়ের তলায় কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। আমরা আবার নৌকায় ফিরে আসলাম। অদ্ভুত একটা বিষয় খেয়াল করলাম প্রচন্ড গরম এবং রোদের তাপ কিন্তু পানিতে হাত দেওয়ার সাথে সাথে জমে গেলাম। সৃষ্টিকর্তা কি এক অপূর্ব লীলা খেলা। এবারে আমাদের গন্তব্য জিরো পয়েন্ট। 15 মিনিটের মতো নৌকা চলার পরে আমরা জিরো পয়েন্টে এসে পৌছালাম। গোসল করার জন্য আদর্শ জায়গা এটা। কিন্তু সাবধান পানি খুব ঠান্ডা তাই বেশিক্ষণ গোসল করাটা কঠিন। কিছুক্ষণ অতিবাহিত করে নৌকা নিয়ে আরেকটু সামনে গেলাম। যেখানে ইন্ডিয়া ও বাংলাদেশের সীমানা পিলার দেওয়া আছে। একটু দূর থেকেই খুঁজে পেলাম দুই পাহাড়ের মাঝখানে ঝুলে থাকা অপূর্ব ঝুলন্ত ব্রিজ। ঝুলন্ত ব্রিজের কাছে যাওয়া যায় না। ওই অংশটি ইন্ডিয়ার ভিতরে পড়েছে। অনেক ইন্ডিয়ার পর্যটক তারা ওখানে ঘুরতে আসে। মজার ব্যাপার হল কেউই বর্ডার লাইন ক্রস করেনা। জাফলং এর সৌন্দর্য প্রতিটি মুহূর্ত আপনাকে মুগ্ধ করবে এ ব্যাপারে আমি 100% গ্যারান্টি দিতে পারি।

বর্ষার সিজেন হলে কথাই নাই আপনি সহজেই জাফলং এর প্রেমে পড়ে যাবেন। এবার ফেরার পালা। সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা টা যুদ্ধ জয়ের মতন। উপরে বেশ কিছু টয়লেট আছে ফ্রেশ হওয়ার জন্য। যদি কেউ ফ্রেশ হতে চান খুব সাবধানে যাবেন। স্লিপ কাটার সম্ভাবনা বেশি আমার অর্ধাঙ্গিনী সামান্য পড়ে গিয়ে হাত ভেঙ্গে ফেললো। তাই যারা যাবেন তারা চেষ্টা করবেন একটু সাবধানে যেতে। ঐ অবস্থায় সিএনজি নিয়ে সিলেটে ফিরে আসছিলাম পথে লালা খালের ঘাট। কিছু সময় ওখানে দাঁড়িয়ে খাল দেখার চেষ্টা করলাম। খালের পানি পুরোটাই নীল কালারের। এখানে ঘণ্টা প্রতি 300 টাকায় ট্রলার ভাড়া পাওয়া যায়। লালাখাল ঘোড়ার সবচেয়ে ভালো সময় বিকেল বেলা। নদীর মাঝখান থেকে ট্রলার ছুটে চলা নীল পানির উপর দিয়ে আর দু’পাশে গ্রামের পরিবেশ এবং জীবনধারা উপভোগ করার মজাই আলাদা। তাই চাইলে কিছু সময় এখানে কাটাতে পারেন। আমাদের সর্ব শেষ গন্তব্য ছিল শাহ পরানের মাজার। সিলেট শহর থেকে 7 কিলোমিটার আগে শাহ পরানের মাজার। চাইলে পুরো মাজারটা ঘুরে দেখতে পারেন। আমরা অবশ্যই দূর থেকে দেখেই চলে এসেছি।

সিলেট ভ্রমণটা বলতে গেলে অসাধারণ ছিলো। শুধু অ্যাক্সিডেন্ট না হলে হয়তো ভ্রমণটা আরো ভালো হতো। যারা সিলেটের ভ্রমণ করবেন অবশ্যই জাফলং এবং রাতারগুল ঘুরতে যাবেন তা না হলে সিলেট ভ্রমণ বৃথা হয়ে যাবে।
***প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্র আমাদের জাতীয় সম্পদ, এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিষ্কার করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। তাই সবাইকে অনুরোধ করছি ভ্রমণ করতে যেয়ে এখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলবেন না। পরিবেশ সুন্দর রাখুন এবং অন্যকেও সুন্দর ভাবে ঘুরতে যাবার সুযোগ করে দিন।

Source:Faysal Khan‎ Travelers Of Bangladesh (TOB)

 

Share:

Leave a Comment

Shares
error: Content is protected !! --vromonkari.com