ঢাকা- চাঁদপুর-বরিশাল-স্বরূপকাঠি-গুঠিয়া-দুর্গাসাগর ভ্রমণ

টানা ৪-৫ দিন ঢাকার বৃষ্টিতে অতিষ্ঠ হয়ে হন্যে হয়ে কাওকে খুঁজছিলাম ঢাকার বাহিরে বের হবার জন্য। পরিকল্পনাকারী সিহাম ভাইয়ের অনুপস্থিতিতেই ৪ জন রওয়ানা দিতে হল ভাসমান পেয়ারা বাজারের উদ্দেশ্যে। সদরঘাট থেকে যদিও রাতের লঞ্চে বরিশাল যাওয়া সুবিধাজনক, আমাদের প্ল্যান ছিল বিকালের লঞ্চে চাঁদপুর যাওয়া। ২-৩ ঘণ্টা সময় চাদপুরে অতিবাহিত করার পরে ওখান থেকে স্টিমারে বরিশাল যাওয়া। লঞ্চ ছাড়ার সময় বিকাল ৫ঃ৩০ মিঃ । চাঁদপুর লঞ্চ টার্মিনালে রাত ৯ টায়। ওখান থেকে বড় স্টেশন ইলিশ পয়েন্টে। উদ্দেশ্য পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া ৩ নদীর মোহনা। রাতের নীরবতা, মৃদু বাতাস, পুর্নিমার চাঁদ আর ৩ নদীর স্রোতের গর্জনে কেমন জানি মনে হচ্ছিল উত্তাল সাগরের তীরে বসে আছি।

নদীর স্রোত এত হিংস্র হতে পারে তা কল্পনার বাহিরে ছিল। সময়টাকে ধরে রাখতে পারছিলাম না। ইলিশের বাড়িতে এসে রাতের খাবারটা ফোর স্টার হোটেলে ইলিশ দিয়েই সম্পন্ন করলাম। আমাদের খুদার্থ পেট, তাদের আপ্যায়ন, ইলিশ ভাজা সব যেন একই বিন্দুতে এসে মিলিত হয়েছিল। রাতের খাবার সেরে চাঁদপুর ট্রেন স্টেশন, ইলিশের আড়ত ঘুরে স্টিমার ঘাট। উদ্দেশ্য বরিশাল। সর্বোপরি এই ৩ ঘণ্টার চাঁদপুর ভ্রমনে আলাদা একটা তৃপ্তটা ছিল। রাত ১১ঃ৩০ এ স্টিমারে যাত্রা শুরু করে সকাল ৭ টায় বরিশাল নদীবন্দর। ওখান থেকে সিএনজি নিয়ে স্বরূপকাঠি। ঘরুয়া পরিবেশে সকালের নাস্তা সেরে ট্রলার নিয়ে ভাসমান ভিমরুলি পেয়ারা বাজার যেখানে কয়েকদিন আগে আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ঘুরে গেলেন।

নামে পেয়ারা বাজার হলেও এখানে লেবু, আমড়ার বেচাকেনাও বেশ জমজমাট। আর বউদির ভাসমান হোটেল তো আছেই। এক হাড়ি পেয়ারা কিনলাম ২৫০ টাকায়। বিক্রেতা বলছিল এখানে ৩০ কেজির মত পেয়ারা আছে। যদিও আমাদের ধারনা তার থেকে খানিকটা কম হবে। তারপর এক পেয়ারা বাগানে ৩০ টাকার টিকিট কেটে “যত খুশি তত খাও” (শুধুমাত্র পেয়ারা চাল্যাঞ্জে অংশগ্রহণ করলাম। দুপরে অনেক হৈ-হল্লোর লাফালাফি করে গোসল পর্ব সেরে গুঠিয়া মসজিদের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। ইচ্ছা ছিল জুম্মার নামাজ ওখানে পড়ার। কিন্তু টাইম ম্যানাজমেন্ট ঠিক মত হয় নি। এমনকি মসজিদে প্রবেশের সময় ও পার হয়ে গেছে। কিন্তু যেখানে শাওন ভাই আর আদিব ভাই আছে ব্যাবস্থা একটা হয়েই যায়।

ফাপরের উপর দিয়ে মসজিদ এরিয়ার ভিতর প্রবেশ করলাম। আমার দেখা সবথেকে সুন্দর মসজিদ এটি। এক কথায় অনবদ্য নির্মাণশৈলী। জুহরের নামাজ শেষে এখান থেকে দুপরের খাবার খেয়ে চলে গেলাম দুর্গাসাগর দিঘীতে। সম্পূর্ণ ট্যুরে এই গুঠিয়া মসজিদের গেইটের সামনের দুপরের খাবারটায় বাঁশ খেলাম। রীতিমত কঞ্চি বাঁশ। একটা মাত্র হোটেল তাই যা ইচ্ছে তাই করছে তারা। এই বাঁশ খাওয়ার তিক্ততা দুর্গাসাগর দিঘির নিরমল বাতাস নিমিষেই ভুলিয়ে দিল। অর্ধেক দিঘি ঘোরার আগেই নির্মল বাতাসে দিঘির ঘাটে ৪ জনেই ঘুমিয়ে পরলাম।

২০ মিনিটের ঘুম সরিরের সব ক্লান্তি নিমিষেই দূর করে দিল। সম্পুর্ন বিকাল সেখানে পার করে চলে এলাম বরিশাল সকালে যাওয়ার সময় শহরটা অনেক পরিষ্কার দেখলেও বিকালে এসেও যে এতটা পরিষ্কার দেখবো ভাবতে পারি নি। শহরে রিকশা দিয়ে ঘুরে চলে আসলাম অক্সফোর্ড মিশন চার্চ এ। অসময়ে আসার কারণে বাহির থেকেই এর সৌন্দর্য উপভোগ করা লাগল। সেখান থেকে বিখ্যাত শশী মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। বরিশাল নামার পর থেকে সবার মুখে এই দোকানের নাম শুনতে শুনতে যা কল্পনা করেছি দোকানে গিয়ে ৪৪০ ভোল্টের একটা শক খেলাম।

আহামরি কিছুই না। তেমন কোন ভিড় পর্যন্ত নেয়। কিন্তু একে একে স্পেশাল ছানামুখি, রস মালাই, স্পেশাল রসগোল্লা খাওয়ার পরও মনে হচ্ছিল রাতের খাবারটা এগুলা দিয়ে করে নিলেই ভাল হয়। একবার তো মনে হচ্ছিল আমাদের উপর হয়তো কোন জ্বিন ভর করেছে, তা না হলে এত মিষ্টি কেন খেতে মন চাচ্ছে। মিস্টিপর্ব শেষে প্রস্থানের পালা। বরিশাল নদীবন্দর এসে টিপু-৭ এর টিকিট কেটে ইসলামিয়া হোটেলের চিকেন খিচুড়ি নিয়ে লঞ্চে উঠে ঢাকার উদ্দেশ্যে যাত্রা।

বিদ্রঃ
★ ভাসমান পেয়ারা বাজারে ঘুরতে ডিঙ্গি নৌকা ও ট্রলার ২ টাই পাওয়া যায়। চেষ্টা করবেন ট্রলার নিতে। যদিও ঘণ্টা প্রতি দাম বেশি তাও এটা সেইফ। আমাদের চোখের সামনেই ট্রলারের ধাক্কায় এক নৌকা ডুবে গিয়েছিল। অনেক ভয় পেয়েছিলাম। ৩ ঘণ্টার জন্য ১৪০০ টাকা দিয়ে আমরা ২ টা টিম কম্বাইন হয়ে ট্রলার ভাড়া করেছিলাম।
★ গুঠিয়া মসজিদে ঘুরার পর ওখানের একমাত্র খাবার হোটেলটি এড়িয়ে চলবেন। একটু সামনেই গুঠিয়া বাজার। ওখানে অনেক খাবার হোটেল পাবেন। পুরা ট্যুর কিছুক্ষণের জন্য মাটি করে দেয়ার জন্য এমন একটা হোটেলের খাবারই যথেষ্ট।
★ বাইতুল আমান (স্থানীয় নাম গুঠিয়া মসজিদ) সুন্দর মসজিদটি দর্শনার্থীদের জন্য দুপুর ১২.৩০ থেকে দুপুর ২. ০০ টা। এবং বিকাল ৪.০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৭.৩০ টা পর্যন্ত উন্মুক্ত। আপনাদের ট্যুর প্ল্যান সেভাবেই সেট করার চেষ্টা করবেন।
★ স্থানীয়দের সাথে ভাল ব্যাবহার করুন। বিনিময়ে ভাল কিছুই পাবেন। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এমনিতেও যথেষ্ট নিবেদিত।
★ যেখানে সেখানে ময়লা ফেলে পরিবেশ বিনষ্ট করবেন না। যে কোন পর্যটন স্থান আমাদের সম্পদ, আমাদের দেশের সম্পদ। এইসব স্থানের প্রাকৃতিক কিংবা সৌন্দর্য্যের জন্যে ক্ষতিকর এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন, অন্যদেরকেও উৎসাহিত করুন। দেশ আমাদের, দেশের সকল কিছুর প্রতি যত্নবান হবার দায়িত্বও আমাদের।

Source: Shaiful Islam <Travelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment

Shares