নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ৪০০০ মাইল রোড ট্রিপ

নিউ ইয়র্ক থেকে ক্যালিফোর্নিয়া পর্যন্ত ৪০০০ মাইল রোড ট্রিপ। মাঝখান দিয়ে কয়েকটা ন্যাশনাল পার্ক ভ্রমন। সব মিলে ১২ দিন। তাই পোস্ট বেশ বড়। এজন্য দুঃখিত।

Day 1-3
New York, Pennsylvania, Ohio, Indiana, Illinois, Iowa পেরিয়ে আজ আমরা Nebraska তে। আমেরিকার ইস্ট কোস্ট এর স্টেট গুলার landscape প্রায় একইরকম । রাস্তার চারদিকে অবারিত সবুজ গাছ। আর কিছুদুর পর পর ছোট ছোট শহর। হাজার হাজার মাইল ছবির মত সুন্দর হাইওয়ে। রাস্তার অবস্থা চমৎকার। আমাদের মতই মানুশ ইন্টারস্টেট ভ্রমন করছে প্রচুর।গাড়ির অভাব নেই। আর বিশাল বিশাল মালামাল পরিবহনের ট্রাক।
এত গাড়ি বহর দেখে যা বুঝলাম, একমাত্র নিউইয়র্কের লাইসেন্স প্লেটই সবচেয়ে সাদামাটা😑😑।
দুরপাল্লার ড্রাইভারদের জন্য কিছুদূর পর পর রেস্ট নেবার জন্য সুন্দর ব্যবস্থা আছে, যাকে বলে ট্র্যাভেল প্লাজা। এমনকি ঘুম তাড়ানোর জন্য পাজল গেমখেলার ও বোর্ড বসানো🤣🤣।
Iowa, Nebraska তে ভুট্টাখেত প্রচুর, যেদিকে চোখ যায় সেদিকে ভুট্টা আর ভুট্টা ।
আরেকটা জিনিস অবাক করল, খেতের পাশে খড়ের গাদা গোল কর দলা করে রাখা। একদম windows 7 সেই ওয়ালপেপার এর মত।

Day 4
Nebraska পেরিয়ে Wyoming এর সীমান্ত ঘেষে আমাদের আজকের গন্তব্য ছিল colorado এর Rocky Mountain national park. Nebraska পার হবার পরই সবুজের সমারোহ কমে আসতে থাকে। আর Colorado তে প্রবেশ এর পর পাহাড় আর পাহাড়। গাড়ি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উপরে উঠতে থাকে।
Rocky Mountain এ দেখার যায়গাগুলা শুরুই হয় ৯০০০ ফিট থেকে। আমি কবি বা লেখক নই। কাব্যিক বিশেষন মাথায় আসে না৷ ইংরেজি এক শব্দে বলা যায় “awesome”. Snow peak mountain + lake মানে ডেডলি কম্বিনেশন। খালি এক্টাই ব্যাপার- আমরা গেছি আগস্ট মাসে। এতদিনে অধিকাংশ মাউন্টেন এই বরফ গলে গেছে, যা আছে তাও কম না। মে মাসে গেলে হয়ত আরো বরফ ঢাকা মাউন্টেন দেখতে পেতাম।
Exit নেবার সময় Trail Ridge Roadনামে একটা Scenic Driveway আছে। আমেরিকার টপ Scenic driveway এর অন্যতম। ৯০০০ ফিট থেকে ১২০০০ ফিটে চলে যায় এই রাস্তা পাহাড়ের মধ্যে এঁকেবেকে,পথের মধ্যে পড়ে Alpine Visitor Center। মোট ড্রাইভিং সময় ১ ঘন্টা। কিন্তু ২ মিনিট পর পর গাড়ি থামিয়ে ছবি না তুললে মহাপাপ হবে। মাথা নস্ট করে দেবার মত সুন্দর। এই আগস্ট মাসেও ভয়নকর ঠান্ডা, তারপরও ১২০০০ ফিট এর চুড়ায় দাঁড়িয়ে স্নো পিক মাউন্টেন গুলা কিছুক্ষন না দেখলেই নয়।

Day -5
Colorado State এর ছোট শহর hot sulphur Spring এ রাত কাটিয়ে আমরা রওনা দিলাম Utah এর উদ্দেশ্যে।
Colorado থেকে Utah যাবার রাস্তা খুব নয়নাভিরাম। বিশাল বিশাল পাহাড়ের মধ্যে রাস্তা একেবেকে গেছে। খালি ছবি তুলতে ইচ্ছা করে একটু পর পর। এমনকি পাহাড়ের ভিতর দিয়েও গাড়ি যাবার টানেলও আছে।
Colorado শেস হয়ে যখন Utah শুরু হয় তখন প্রকৃতি আরেক রকম। Colorado এর পাহাড় সব সবুজে ঘেরা। আর Utah এর পাহাড় সব কেমন যেন ন্যাড়া। লাল রঙ এর।
চারদিকে বিরানভুমি। ধু ধু প্রান্তর, একটা বাড়িও নেই। কিছুদুর যাবার পর কেমন ফাকা ফাকা লাগে।
আজকের গন্তব্য ছিল Arches National Park. হঠাত করেই এই বিরানভুমির মধ্যে বিশাল বিশাল লাল রঙ এর পাহাড় নানারকম আকারে নানা ভাবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমবার দেখলে ব্যাখা করা কঠিন। এদের মধ্যে একটা হল balanced Rock. ছোট এক পাথর এর ওপরে বিশাল এক পাথর সুন্দরভাবে বসে আছে। পুরাই অদ্ভুত।
এরকম নানা রকম পাথর পাহাড়, নানা শেইপ এ সাজানো, বিশাল যায়গা জুড়ে। কেন কিভাবে এরকম হল সময় পেলে একদিন পড়তে হব।
সবশেসে রাতের বেলা হোটেল এ ফিরছি গাড়ি করে। মাইলের পর মাইল কিছু নেই, সম্পুর্ন অন্ধকার, আবার হঠাত করে দেখি ছোট ছোট শহর জোনাকি পোকার মত জলজল করছে।
পরবত গুলো সব বিশাল ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার সামনে। It always seems like we are entering the mountains. But mountain is always ahead of us, never getting caught.
They are saying ”Catch me if you can”.

day 6
আজকের গন্তব্য Utah এর বিখ্যাত Zion National park। বলতে গেলে আরেকবার মাথা নস্ট হবার যোগাড়। Utah সম্পরকে সব ধারনা একদিনেই বদলে গেল। Colorado পাহাড় সব সবুজে ঘেরা, একইরকম। আর Utah হল লালপাহাড় আর সবুজের কম্বিনেসন,অনেক বৈচিত্রময়,মনোরম ।Arches National Park ছিল মরুভূমির মত, অনেক গরম আর শুধু লালের সমারোহ. Zion হল লাল আর সবুজের অপুর্ব মিস্রন, আবহাওয়া চমৎকার।
প্রথমে আমরা গেলাম The Narrows, ২ পাশে বিশাল উচুলাল পাহাড়, এর মধ্যে বয়ে যাওয়া অল্প গভীরপানির ট্রেইল। এরপর গেলাম Weeping Rock, Lower Emerald Pools. ছোট একটা ট্রেইল দিয়ে. ভিউ চমৎকার।
আর সবশেসে Canyon Overlook। ১ ঘন্টার ট্রেইল, খানিক টা কঠিন। ট্রেইল শেসে যে ভিউ দেখলাম আমার জীবনের এ যাবত Mountain চুড়া থেকে দেখা সেরা ভিউ। এ জিনিস ছবি ছাড়া ব্যাখা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
এক ট্রেইল পয়েন্ট থেকে আরেক পয়েন্ট যাবার জন্য বাস আছে, গাড়ি করেও যাওয়া যায়। খুব সুন্দর scenery। এক যায়গায় পাহাড়ের মধ্যে বিশাল টানেল বানানো গাড়ি যাবার জন্য। প্রায় ১ কিলোমিটার লম্বা টানেল।
আজকে নতুন এক জিনিস দেখলাম।ট্রেইল এর পথে পথে রেলিং দেয়া, যাতে মানুস না পড়ে যায়। এখানে এরা কতটা যত্নবান তার প্রমান। এসব দেখলে আফসোসও লাগে।আমাদের বান্দরবান ট্রেইল গুলাও কম সুন্দর না, কিন্তু আমরা কি করে রেখেছি। আর আমেরিকার মানুসজন এর বিপদ আপদ নিয়ে চিন্তা ভাবনা পুরা আলাদা। রাত হয়ে আসছে। তবুও এরা পুরা বাচ্চাকাচ্চা বুড়া বুড়ি পরিবার সহ Canyon Overlook এর মত ট্রেইল এ যাচ্ছে।
সুন্দর আর বৈচিত্র এর বিচারে Utah হারিয়ে দিবে Colorado কে।.
মোদ্দা কথা, I am in love with Utah Now. Those who live here are lucky indeed।

Day 7
কিছু বলার নাই, ইহা “THE “Grand Canyon
এক্টাই জিনিস অবাক করল। যখন Arches বা Zion এ যাচ্ছিলাম, তখন যাওয়ার পথেই বুঝা যাচ্ছিল, কোন টাইপ জায়গায় যাচ্ছি, চারদিকে লাল লাল পাহাড়।
আর গ্র্যান্ড ক্যানিয়ানে ড্রাইভ করে যাবার পথে চারদিকে Kaibab National Forest.মনেই হয় না গ্রান্ড ক্যানিয়ান টাইপ যায়গায় যাচ্ছি। North Rim এর Bright Angel point থেকে Imperial Point আর Cape Royal যাবার পথে চারদিকে সবুজ, লাল গাছের সমারোহ। আবার হঠাত করে দেখি চারদিকে ন্যাড়া, ডেড ট্রি।
আর সবশেসে সামনে হাজির গ্রান্ড ক্যানিয়ন,প্রকৃতি বোঝা বড়ই অদ্ভুত।

Day 8-9
লাস ভেগাস এর Caesar Palace এ ব্যুফে লাঞ্চ করে আমরা রওনা দিলাম গোল্ডেন ষ্টেট এর দিকে। লাস ভেগাস এর ৭ লেইন এর রাস্তায় ড্রাইভ করা এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। পথে পড়ল Mojave National Preserve.
California প্রবেশের পর প্রথমে মরুভুমি, তারপর আস্তে আস্তে চারদিকে সব সবুজ। পাহাড় আর সবুজের এক অপুর্ব মিস্রন। এর সাথে পাহাড়ের ওপর সোনালি রঙ এর ঘাস। চারদিকে নানা জাতের ফলের গাছ।
Bakersfield রাত কাটিয়ে আমাদের আজকের গন্তব্য California – Pacific Coast Highway- ওয়ার্ল্ড এর নান্দনিক ড্রাইভ গুলার অন্যতম।এই ট্রিপ এই দেখলাম কত পাহাড়, আর Saint Martin যাওয়া আমাকে বিচ দিয়ে অবাক করা কঠিন ।
কিন্তু পাহাড় আর সমুদ্রের এই মিস্রন যে এত সুন্দর হতে পারে অকল্পনীয়। মনে হল ইতালীর সিসিলি তে চলে আসছি।পাহাড়ের মধ্যে একেবেকে রাস্তা চলে যায়, আর অনেক উপর থেকে বিশাল প্রশান্ত মহাসাগর এর হাতছানি, পানির রঙ আবার তিন লেয়ারে, নীল, হাল্কা নীল, গাড় নীল। পাহাড়ের মধ্যে করা রাস্তা আবার ভিতরে বনের মধ্য দিয়েও বিস্তৃত। একই সাথে বন, পাহাড় আর সমুদ্র তিন টাই দেখা যাবে ফ্রি তে।
প্রথমে Pfeiffer beach এ গেলাম ( যেটা big Sur state park এর অন্তর্ভুক্ত) । সমুদ্রের পানি দেখলেই আমার এট লিস্ট হাটু পানিতে নামা লাগবেই। কিন্তু প্রশান্ত এর পানি ভয়নকর ঠান্ডা। হায়েস্ট ৫ সেকেন্ড এর বেশি থাকতেই পারলাম না।
এর পর গন্তব্য Carmel by the sea নামক ছোট এক বিচ টাউন। আমার দেখা এ অবধি সবচেয়ে সুন্দর শহর। শুধু বিচের পাশে আছে বলেই নয়, এই শহরের প্রত্যেকটা বাসা যেন এক বোটানিকাল গারডেন। নানা জাতের অদ্ভুত রঙ এর ফুলের গাছ এর সমারোহ প্রত্যেক বাসার সামনে । একটাও বাসা দেখলাম না যেটাতে কোন নাম না জানা অন্যজাতের গাছ নেই। আভিজাত্য আর বড়লোকি কারবার।
ফাইনালি, যাবার পথে Bixby ব্রিজ এর সামনে একটা ছবি তুলে আসলাম। এখানে আসা সার্থক অবশেসে।

Day 10
Behold the mighty “Yosemite “. The busiest national park in USA। যত ন্যাশনাল পার্ক দেখলাম এই টুরে , সব যায়গায় আমেরিকান মানুষ বেশি। আর এই পার্কে চাইনিজ আর ভারতীয় দর্শনার্থী ভরপুর। পাক্কা দেড় ঘন্টা লেগেছে পারকিং পেতে, যদিও শেষ পর্যন্ত Yosemite এর দৃশ্য সব ভুলিয়ে দিয়েছে। . টানেল ভিউ থেকে Yosemite এর signature সিনারিটা দেখলাম। মনে হয় যেন একটা ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। Vernal Falls আর El Capitan(সিঙ্গেল রক যেটা ৩০০০ ফিট উঁচু) আমরা গেলাম Glacier point . অখানে সূর্যাস্ত দেখে তারপর হোটেলে ফেরা ।

Day 11-12
আজকের গন্তব্য Point Reyes National Seashore। Pacific Ocean এর পাশে এক প্রাকৃতিক বিচারনভুমি। বিচ হাউস টা বন্ধ ছিল, তাই লাস্ট পয়েন্টে যেতে পারি নি। এরপর গন্তব্য Cypress Tree Tunnel। মানুশজন নানা অঙ্গ ভঙ্গীতে এই সিগনেচার প্লেস এ ছবি তুলে রাখার প্রাণান্ত চেস্টা করে যাচ্ছে। দেখে মজাই লাগল। এক চাইনিজ তরুণী প্রায় ২০ মিনিট ধরে লাফালাফি করে অতঃপর তার পরম কাঙ্ক্ষিত ছবি তুলতে পারল কিনা জানা হল না আর।

আর আমাদের এই টুরের শেষ গন্তব্য San Fransisco. আর San Fransisco বলতে একটাই চোখে ভাসে, গোল্ডেন গেট ব্রিজ। আসলে এই ট্যুরে এত সুন্দর যায়গায় গেছি, এখন সান ফ্রান্সিস্কোও আমাকে আর মুগ্ধ করতে পারল না, ( নাকি আমি মুগ্ধ হবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি কে জানে)। পরের দিন সকালে ব্রিজে বিপরীত সাইড দিয়ে গেলাম। এই সাইড দিয়ে ব্রিজে সরাসরি ওঠা যায়। কিন্তু সকালে ব্রিজের ওপর দিয়ে প্রচুর কুয়াশা। ব্রিজ টাও ঠিকমত দেখা যায় না।

সেদিন আমার প্লেন ছিল রাতে। তাই সময় নিয়ে গেলাম সান ফ্রান্সিকো পিয়ারে। জীবনে প্রথম দেখলাম বামহাতি দের জন্য আলাদা দোকান,আমি নিজে বামহাতি বলে খুব ই এক্সাইটেড। আর শেষ গন্তব্য চায়না টাউন। চায়না টাউন নিয়ে আলাদা করে কিছু বলার নেই।
সানফ্রান্সিসকো এর রাস্তা গুলো সব ৩০ ডিগ্রি খাড়া। আমার ড্রাইভিং এ অভিজ্ঞ চাইনিজ বন্ধুও ভয় পেয়ে গেল।

অতঃপর সানফ্রান্সিসকো এয়ারপোর্ট থেকে আমার যাত্রার এখানেই সমাপ্তি। এক রকি মাউন্টেন ছাড়া আর বাকি সব ন্যাশনাল পার্কের বেশ কিছু সুভেনিয়র কিনলাম। অনেক খরচের ব্যাপার। তবুও নিজেকে কেন জানি একটুও ফতুর মনে হল না।

Source:  Chinmoy Saha

Share:

Leave a Comment

Shares