পৃথিবীর ছাদ – পামির মালভূমি ভ্রমণ

হটস্প্রীং দেখার পর আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম ইশকাশিম এর উদ্দেশ্যে। ইশকাশিম পামিরের একটি গ্রাম মূলত। ওয়াখান ভ্যালি শুরু এই ইশকাশিম থেকে। ওয়াখান ভ্যালি হল মূল পামির হাইওয়ে থেকে আলাদা একটা রাস্তা, কিন্তু এলাকাটি এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। পূর্বের সিল্করোডের বনিকগন ওয়াখান ভ্যালি দিয়ে সাধারনত যাতায়াত করত না, কারন রাস্তাটি দীর্ঘ। কিন্তু যেহেতু আমরা ঘুরতে এসেছি, তাই আমরা ওয়াখান ভ্যালি বাদ দিতে চায়নি। গাড়ি চলতেসে হেলে দুলে, রাস্তার অবস্থা সেরকম সুবিধার না। ড্রাইভার বার বার জিজ্ঞাসা করতেসে আমাদের কোন সমস্যা হচ্ছে কিনা, কিন্তু আমি তারে বললাম, আমি আসছি বাংলাদেশ থেকে, এর চেয়েও ভাল এক্সপেরিয়েন্স আমার আছে। আমি অপু ভাইকে বললাম সিলেটে বিছানাকান্দি যাওয়ার রাস্তা এর চেয়ে বাজে ছিল! (আমি জানিনা এখন সিলেটের রাস্তার কি অবস্থা, কিন্তু আমি যখন গিয়েছিলাম তখন বিছনাকান্দির রাস্তার অবস্থা খুবই সোচনীয় ছিল)

তখন পর্যন্ত গরবের অপারেটরে নেটওয়ার্ক ছিল। মনে হচ্ছিল খড়গ এর টাওয়ার থেকে নেটওয়ার্ক আসতেসে। ভালই লাগতেসিল, একদিকে নেটওয়ার্ক আছে, ইন্টারনেট ব্যাবহার করা যাচ্ছে, আরেকদিকে আশেপাশের সৌন্দর্য দেখা যাচ্ছে। কিছুদূর যাওয়ার পর আমাদের ড্রাইভার বলল সে একটি টিলায় উঠবে। যায়গাটি বলে ছবি তোলার জন্য বিখ্যাত। মানুষজন বলে এই টিলার উপর উঠে ছবি তুলে। টিলাতে উঠার রাস্তাটি পাকা না, কাচা রাস্তা। একমুখি রাস্তা, তাই কেউ যখন টিলা থেকে নামে তখন আরেকজন উঠতে পারে না। আমরা কিছুক্ষন অপেক্ষা করলাম একটা গাড়ির টিলা থেকে নামার জন্য। কিছুক্ষন পর আমাদের সূযোগ হল সেই টিলাতে উঠার!

টিলাতে উঠেই এখানের সৌন্দর্য দেখে আমরা দুজনই বিমোহিত হয়ে গেলাম। এক পাশে তাজিকিস্তানের পাহার, আরেকপাশে আফগানিস্তানের পাহার, মাঝখানে নীল রঙের পানি প্রবাহিত আকাবাকা হওয়া পান্জ নদী, আমাদের সমান সমানে মেঘ! ছবি তুলার অনেক চেষ্টা করলাম, কিন্তু ছবিতে কোনভাবেই আনতে পারলাম না সেখানের সৌন্দর্য। আমার মনে হয় আমরা যে ছবিগুলা তুলসি, সেটা সেই জায়গার সৌন্দর্যের ১% ও বর্ণনা করে না! ছবি ইডিট নিয়ে আইডিয়া ধরতে গেলে নাই, তাই কোন ধরনের ইডিটও করা যাবে না! 🤨 পামিরের সৌন্দর্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনমুগ্ধকর লেগেছে আমার কাছে মেঘ। পাহাড়ে ঘুরতে গেলে অনেক উপর থেকে মেঘ দেখা যায়, বা নিচে মেঘ দেখা যায়। কিন্তু সমতল ভূমিতে মেঘ দেখা যায় না। কিন্তু পামির অনেক উচুতে বিরাট একটা এলাকা হওয়ায় সমতল ভূমিতেই মেঘ দেখা যায়। অনেকসময় দেখা যায় বিস্তির্ন মাঠ, মাঝখানে মেঘ!

কানটুপি আর জ্যাকেট পরায় আমাকে পুরা আসল তাজিক তাজিক লাগতেসিল। খালি দাড়িটা না থাকলেই ফুলটুফুল তাজিক হয়ে যেতাম। টিলাটার অপরপ্রান্তে দেখতে পেলাম কি জানি চাষ করতেসে। একজন ট্রাক্টার চালিয়ে ক্ষেত তৈরি করছে। গাছ থাকলে বুঝা যাইত কি ধরনের সবজি চাষ করতেসে, কিন্তু শুধুমাত্র ক্ষেত দেখে বুঝার উপায় নাই আসলে কি শষ্য চাষ করছে। মনে করসিলাম আমাদের দেশের মত হাল চাষ করবে, গরুর বদলে ইয়াক দিয়ে টানাবে, কিন্তু বুঝলাম এখানেও আধুনিকতার ছোয়া লেগে গিয়েছে! 😉😉 😉। তার পাশেই দেখলাম বিরাট এক ভেড়ার পাল মাঠে চরে বেরাচ্ছে। মাঝখানে কিছু কিছু ইয়াকও দেখতে পেলাম। তখনই ঝিড়ি ঝিড়ি বৃষ্টি শুরু হল। বৃষ্টি দেখলে মনে হচ্ছিল যেন তুষার পড়তেসে! তখনও আমি আর অপু ভাই কেউই লাইফে সামনা সামনি তুষার দেখি নাই! তাই আমরা ফেসবুকে কিছুটা ভাব নিতে তুষারের সাথে নিজেদের ছবি তুলে নিলাম! 😉😉😉😉😅😅😅

ড্রাইভারের তাগাদা আর শীরশীর বাতাসে টিকতে না পেরে আমরা আবার গাড়িতে ফিরে আসলাম। এবার টিলা থেকে নামার পালা! নামতে যেয়ে দেখি একটা মালগাড়ি উঠতেসে, তাই আমাদের ১৫ মিনিটের মত অপেক্ষা করতে হল! আমি চিন্তা করলাম বাংলাদেশ হইলে আমাদের ড্রাইভার গাড়ি নামায় দিয়া বইসা থাকত, এরপর দুইজন মারামারি করত! ভাগ্য ভাল তাজিক ড্রাইভার, এরা একজনের ব্যাপারে আরেকজন অনেক সহনশীল। মালগাড়ির ড্রাইভার উপরে উঠার পর আমরা নামা শুরু করলাম। উপড়ে উঠার সময় বুঝতে পারি নাই রাস্তাটা কত রিস্কি, নিচে নামার সময় বুঝলাম, কি রিস্কি! গাড়িটা স্লিপ কেটে পড়লে নিচে পান্জ নদী, আর উপরে আল্লাহ বাদে আর কিছু নাই! আমাদের ড্রাইভার অবশেষে সফলতার সাথে গাড়ি নিচে আসল রাস্তায় নামিয়ে আনতে পারল আর আমরা আবার পামির হাইওয়ে ধরে যাত্রা শুরু করলাম ইশকাশিম এর উদ্দেশ্যে!

আশেপাশের প্রকৃতি অতি দ্রুত বদলাচ্ছিল। কিছু পাহাড় দেখে মনে হবে কি পরিমান ভঙ্গুর, আর কিছু পাহার দেখে মনে হবে কত সুগঠিত। বেশিরভাগ পাহাড়ই আফগানিস্তানের অংশে, এসব দেখে আফগানিস্তানে ভ্রমনের ইচ্ছা আরও বেড়ে গেল! একটা জিনিস ভেবে খুব অবাক লাগল, আমাদের দেশে কোন একটা খালি স্থান থাকলেই সেখানে আর কিছু না গজাক, ঘাষ গজাবেই, কিন্তু এখানে আশে পাশে ছোট ছোট গুল্ম জাতীয় উদ্ভিদ বাদে আর কিছুই দেখতে পেলাম না!। কিছু কিছু শুকনা গাছ, লতাপাতা। বেশিরভাগই শুকিয়ে রয়েছে। যাওয়ার পথে একটু পর পরই আমরা গাড়ি থামিয়ে গাড়ি থেকে নামলাম আর ছবি তুললাম। আমি হঠাৎ চিন্তা করলাম একটা উড়ন্ত ছবি তুললে কেমন হয় 😉😉😉! যেই ভাবা সেই কাজ, লাফ দিয়ে ছবি তুলার জন্য অপু ভাইকে বললাম। আমি লাফ দিব আর উনি ছবি তুলবে। বসে থাকা চাকরির কারনে শরীরের যে কি বারোটা বাজাইসি সেটা বুঝা গেল। একটা লাফ দিতে দেখি আমি পারি না 😕😕😕! শারীরিক পরিশ্রম করা হয় না অনেকদিন, তার উপর প্রায় ১ বছর ধরে সাইকেল চালানো বাদ দিয়েছি আর তার ফল হারে হারে ট্যার পাওয়া গেল। এরপর ২-৩ বাড়ের চেষ্টায় আমি সফলভাবে লাফ দিতে পারলাম, আর লাফ দেওয়ার পর দম একদম শেষ হয়ে গিয়েছিল। ভাবলাম, অধিক উচ্চতার জন্যই হয়ত দম থাকতেসে না, তাই আসলে লাফ দিতে পারতেসি না! (সান্তনা আরকি😉😉😉😉😉😅😅😅)। আমার পড়ে অপু ভাইও চেষ্টা করল, কিন্তু তারও একই অবস্থা! উনার লাফ দিলে পা মাটিথেকে বেশি উপড়ে উঠতেসে না! দুইজনই বুঝলাম সারাদিন বসে থাকার কুফল এখন আমাদের হাতে নাতে ধরা দিচ্ছে! আমি মজা করে বললাম “বয়স হয়ে যাইতেসে! 😞😞😞”।

অনেক লাফালাফির পর কাঙ্খিত ছবি পেয়ে আমরা আবার গাড়িতে ফিরে আসলাম। বাইরের আবহাওয়াটা তখন অনেক সুন্দর ছিল। রোদ উঠেছে, কোন বৃষ্টি নেই তার উপর পরিষ্কার আকাশ। আমাদের দেশের শরৎের আকাশের মত অনেকটা, কিন্তু বাতাস আমাদের দেশের শীতের মত 😉😉😉😉! মনে হল এটা এখনের বসন্তকাল খুব সম্ভবত, পরে আবার ভাবলাম বাংলা ঋতু এখানে কাজ করার কথা না, আবারও ভাবলাম, ঋতু তো ঋতুই, বাংলা হোক আর তাজিক সবই তো একই! যদিও এককালে ঢাকা শহরে শরৎের সুন্দর আকাশ দেখা যেত, কিন্তু আমি শেষ কয়েকবছর ধরে আর সেটা দেখি নাই! যদিও বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে এখনের আবহাওয়া তুলনা করা উচিত না, তাও বাঙালি তো, তুলনা চলেই আসে!

আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম, কিছুদূর যাওয়ার পর দেখতে পেলাম রাস্তার পাশে সাদা রঙের কিছু একটা! ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করায় বলল এগুলা তুষার হতে জমে যাওয়া বরফ। এখনও গলা শেষ হয় নাই, কিছুদিন পরই গলে যাবে! জীবনে প্রথমবার তুষার দেখার সৌভাগ্য অর্জন করার জন্য আমরা গাড়ি ব্যাক নিতে বললাম! আমি তখন পুরা উত্তেজনায় কাপতেসি, জীবনে প্রথমবার তুষারের বরফ দেখব। আমি কাশ্মির বা লাদাখ যাই নাই, তাই আসলে তুষারও দেখা হয় নাই! আমাদের গাড়ি জমাট বাধা তুষারের পাশে রাখল, আমরা দুজনই গাড়ি থেকে নেমে গেলাম জীবনে প্রথমবার তুষার হাতে নিয়ে দেখতে। অনেক আগের তুষার হওয়ায় কিছুটা ময়লা হয়ে গিয়েছিল, তাও আমরা সেখান থেকে হাত দিয়ে তুষার নিয়ে ছবি তুললাম! জীবনের একটা ইচ্ছা পূরন হল! আজীবন শুধু সিনেমাতেই তুষার দেখে গিয়েছি, কিন্তু তুষার বরফ ধরা হয় নাই কোনদিন! দুজনই গায়ে একটু তুষারের বরফ লাগিয়ে ছবি তোলার চেষ্টা করলাম যাতে ইন্সট্যান্টলি ফেসবুকে দেওয়া যায় 😅😅😅😅😅 (তখনও গরিবের অপারেটরে ২ জি নেটওয়ার্ক আছে, আমরা হালকা পাতলা মেসেজ পাঠাতে পাড়ছি)। ড্রাইভার আমাদের এই উত্তেজনা দেখে মোটামুটি অবাকই হল। সে বুঝতে পারছে না এটা দেখার কি আছে! কিন্তু আমরা তো তারে বুঝাইতে পারব না, আমরা যেই দেশে থাকি, বিশেষ করে যেই শহরে থাকি, সেখানে এই জ্যাকেট পড়ার শীতই পরে না, বরফতো আরও পরের ব্যাপার। তুষারের বরফ হাতে নিয়ে বুঝতে পারলাম, যতটুকু ঠান্ডা চিন্তা করেছিলাম, আসলে ততটুকু ঠান্ডা না জিনিসটা। হাত জমাট বাধে নাই এই তুষারের বরফে, তাই চিন্তা করলাম হয়ত তুষারের বরফ বেশি ঠান্ডা হয় না! 🤣🤣🤣🤣🤣🤣 (যদিও পরবর্তীতে এই ধারনা একদম ভূল প্রমানিত হয়)

তুষার ছুরাছুরি করে আবার আমরা যাত্রা শুরু করলাম ইশকাশিম এর উদ্দেশ্যে। রাস্তার অবস্থা খুব একটা ভাল নয়। কাচা রাস্তাও বলা যায় না, আবার এটাকে পাকা রাস্তাও বলা যায় না। পুরাটুকুই পাথর দিয়ে তৈরি, কিন্তু সমান। হয়ত আগে পিচ ঢালাই রাস্তা ছিল, ভাঙগে ভাঙতে এই অবস্থা হয়েছে! বাংলাদেশের মত এই রাস্তায় হয়ত ট্রাক চলে না, কিন্তু চায়না থেকে আসা বড় বড় লরি এই রাস্তা দিয়েই যায়, যেগুলোর ওজন আমাদের ট্রাক গুলার থেকে অনেক বেশি আমার কাছে মনে হল। ড্রাইভারের সাথে কথা বলে জানলাম, পামির হাইওয়ে এর তাজিকিস্তান অংশের বাকিটুকু রাস্তার অবস্থা এরকমই। আশে পাশের গ্রামীন রাস্তা পার হয়ে আমরা ইশকাশিম এর দিকে যেতে থাকলাম! গ্রামের মধ্যে ছোট ছোট বাচ্চা খেলাধুলা করছে, মোটামুটি সব দোকানপাট বন্ধ কারন সেদিন রবিবার। প্রায় প্রত্যেকটা গ্রামেই বিড়াট বড় বড় কুকুর রয়েছে, যেটার সামনে দিয়ে গাড়ি গেলেই ঘেও ঘেও করে উঠে! কুকুরগুলো দেখতে আমাদের দেশের কুকুরের মতই, কিন্তু আকারে অনেক বড়। এই কুকুরগুলোই মূলত ভেড়ার পাল সামলিয়ে রাখে। ড্রাইভারের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলাম এই কুকুরগুলো অচেনা কাউকে পাইলেই বলে কামড় দেয়! আমার কোন শখ হল না এই তাজিকে এসে পেটে ১৪ টা ইন্জেকশন খাওয়ার, তাই কুকুর দেখলেই সাবধানে থাকা শুরু করলাম! মোবাইল চেক করে দেখলাম গরিবের অপারেটর Beeline এ নেটওয়ার্ক আছে, কিন্তু ২জি ইন্টারনেট কাজ করে না, তখনও জানিনা নেটওয়ার্ক যে গেল, আবার কবে ফেরত আসবে, অক্সিজেন ছাড়া বাকিদিন কিভাবে কাটাবো!

এই পর্বে এতটুকুই থাকুক। পরবর্তী পর্বে বলা যাবে কিভাবে ইশকাশিমে হোমস্টে খুজে পেলাম, ওয়াখান ভ্যালির সংস্কৃতি, পরিবার প্রথা নিয়ে কি জানলাম, সেখানের এক কিশোরের ক্যারিয়ার প্ল্যান কি ধরনের হয়, বাংলাদেশে আমরা কত পরিমান ভাগ্যবান চাকরির সুযোগ থেকে, এত দূর্গম এলাকায় চিকিৎসা সুবিধা কেমন, অক্সিজেন (মোবাইল নেটওয়ার্ক) পাওয়ার জন্য কি কি করতে হল, ইশকাশিম থেকে লাঙ্গারে কিভাবে পৌছালাম সহ আরও অনেক কিছু!
Source: Safwan Rahman‎<Travelers of Bangladesh (ToB)

 

Share:

Leave a Comment

Shares