প্রকৃতির কাছাকাছি লোভাছড়া’য় একদিন

অনেকদিন ধরেই বন্ধুরা মিলে কোথাও বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা হচ্ছিল। আজ এর সমস্যা তো কাল ওর। ফলে কোনো পরিকল্পনাই সফল হচ্ছিল না। এর একটা বড় কারণ অবশ্য ছিল। আর তা হলো সবার ব্যস্ততা। কেউ ব্যস্ত চাকরি নিয়ে কেউবা আবার পারিবারিকভাবে।

গত রোজার ঈদের দিন অনেকদিন পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় হঠাৎ করেই আবার কথা শুরু হলো ঘুরতে যাওয়ার বিষয় নিয়ে। কেউ অনেক দূরে যেতে চায়, কেউবা আবার যেতে চায় আশপাশের কোনো দর্শনীয় স্থানে।

একটা কথা বলে রাখি, আমরা পরিকল্পনা করছিলাম সিলেটে আমার বাড়িতে বসে। কয়েকজন আবার সিলেটের বাইরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য মরিয়া। ওদের যুক্তি হলো সিলেটের ঘুরতে যাওয়ার মতো সব জায়গাতেই তারা কয়েকবার করে গিয়েছে। আবার কয়েকজনের কথা হলো তিন দিনের ছুটি, একদিন হয়ত সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো যাবে, কিন্তু একদিনের বেশি নয়।

শেষে আমিই দিলাম সমাধানটা। সবাইকে বললাম আমরা সিলেটের ভিতরেই থাকব কিন্তু এমন যায়গায় যাব যেখানে আমাদের কেউ আগে কখনো যায়নি। কথামতো সবাই রাজি হলো।

পরদিন সকালে (সকাল না বলে দুপুর বলাই ভালো হবে) সবাই মিলে আমরা আমাদের যাত্রা শুরু করলাম মাইক্রোবাসে করে। আমাদের গন্তব্যস্থল সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লোভাছড়া চা বাগান।

সিলেট জাফলং রোডে যাত্রা শুরু করে মাইক্রো যাবে কানাইঘাট বাজার পর্যন্ত, আর কানাইঘাট বাজারঘাট থেকে যেতে হবে নৌকা করে। চা বাগান শুনে অনেকেই মনে করতে পারেন সিলেটে তো চা বাগানের অভাব নেই তাহলে লোভাছড়া কেন? এখানেই অন্যান্য চা বাগান আর লোভাছড়া চা বাগানের পার্থক্য।

নৌকায় যেতে যেতে যে দৃশ্য চোখে পড়ে তা দেখে চোখ ফেরানো প্রায় অসম্ভব। পাহাড়ের সবুজ আর স্বচ্ছ পানি যে কাউকেই মুহূর্তেই বানিয়ে দেবে প্রকৃতি প্রেমী। আর হাতে ক্যামেরা থাকাতে আমার খুশি আরেকটু বেশি। আমি ব্যস্ত হয়ে পরলাম ছবি তুলতে।

বন্ধুরা সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। এই দৃশ্য দেখা যাবে প্রায় দেড় ঘণ্টার মতো। এরপর লোভাছড়া বাগানের ঘাটে নৌকা থামতেই চোখে পড়ে নৌকায় সবুজ চা পাতা তোলার দৃশ্য। বাগান থেকে চা পাতা এনে নৌকা করে নিয়ে যাওয়া হবে। একটু হাঁটলেই বাগান। বাগানে ঢোকার জন্য আমাদের আগে থেকেই আনুমতি নেওয়া ছিল। বাগানে ঢুকে একটু ভেতরে যেতেই সবাই একদম নিশ্চুপ। বাগানবাড়িটা দেখেই সবার এই অবস্থা। প্রকৃতি আর মানুষের এমন সহাবস্থান কমই দেখা যায়।

আমরা কিছুক্ষণ এখানে বসে আড্ডা দেওয়ার পর সবাই মিলে পুরনো দিনে ফিরে গেলাম। বাচ্চাদের মতো ছুটাছুটি করলাম অনেকক্ষণ। অনেকদিন পর অনেক মজা করার একটি উপলক্ষ কেউ ছাড়ল না।

সন্ধ্যা হয়ে গেলে আমরা আবার নৌকায় উঠলাম। লোভাছড়ার পাশ দিয়ে যে বয়ে গেছে একটি খাল যা লোভাছড়া নদী থেকেই উৎপন্ন। এ নদীরইপর বেশ পুরোনো একটি ব্রিজ আছে যা থেকে বাংলাদেশ- ভারত উত্তর সীমান্তের পাহাড় ঘেরা আবছা ছবি দেখা যায়। বাগানের সবচেয়ে উঁচু বাংলো থেকে দেখা যাবে স্বচ্ছ জলের লোবাছড়া নদী।

যেভাবে যাবেন লোভাছড়ায়: সিলেট শহর থেকে তিনটি সড়কে কানাইঘাট সদরে পৌঁছার সুযোগ আছে। বাস অথবা সিএনজি-অটোরিকশায় করে সরাসরি দরবস্ত-চতুল হয়ে কানাইঘাট সদরে যাওয়া যায়। অন্যদিকে, গোলাপগঞ্জ-চারখাই-শাহবাগ হয়ে জকিগঞ্জ সড়ক দিয়ে কানাইঘাট পৌঁছা যাবে। এছাড়া গাজী বুরহান উদ্দিন সড়ক দিয়ে সিলেট-গাছবাড়ি সড়ক হয়ে কানাইঘাট সদরে পৌঁছার সুযোগ রয়েছে।

সিলেট শহর থেকে কানাইঘাট সদরে বাসভাড়া সর্বোচ্চ ৬০ টাকা এবং সিএনজি-অটোরিঙা ভাড়া সর্বোচ্চ একশ’ টাকা। রিজার্ভ সিএনজি পাঁচশ’ থেকে সাতশ’ টাকা। তিন পথেই সিএনজি যোগে যাওয়া যাবে কানাইঘাটে।

তবে যারা ব্যক্তিগত গাড়ি নেয়ে যেতে চান তারাও যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে আগে থেকেই সে জায়গা চেনে এমন কাউকে নিয়ে গেলে সুবিধা হবে।

এছাড়া সম্প্রতি কানাইঘাটে সুরমা নদীর ওপর ব্রিজ হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও সহজ হয়েছে।

কানাইঘাটে পৌছার পর বাজার থেকে নৌকাযোগে যেতে হবে লোভাছড়ায়। জনপ্রতি ৩০ থেকে ৪০টাকা নৌকা ভাড়া লাগবে। এছাড়া রিজার্ভ নৌকা নিলে তিনশ’ টাকার বেশি হবে না। আর লোভাছড়া ঘুরতে সময় লাগবে প্রায় ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা।

সবুজে আচ্ছাদিত, অপরূপ বন, স্বচ্ছ পানির ঝর্ণা আর নদী, পাথর সমৃদ্ধ লোভাছড়া আপনাকে বিমোহিত করবে এটা বলতে পারি নির্দিধায়।

Share:

Leave a Comment

Shares