ফিলিপাইন ভ্রমণ বিতান্ত ও খরচাবলি

সময় সুযোগ পেলেই ঘুরতে যাওয়ার চেষ্টা করি আমি। সেই অনুযায়ী গত জুলাই মাসে জেনেছিলাম যে, অগাস্টের শেষদিকে সপ্তাহ দু’য়েকের জন্য দেশের বাইরে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ আছে।
সেই সময় থেকে শুরু করলাম প্রয়োজনীয় তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ। এখানে বলে রাখা যেতে পারে যে, অনেক আগে থেকেই আমি একটা তুলনা মূলক ছক করে রেখেছি । ভবিষ্যতে যেখানে যেতে চাই, এমন ৬/৭ টি দেশে ভ্রমণের জন্য আনুমানিক খরচের একটা তালিকা করা আছে। যেমনঃ – সেই দেশে এয়ার ফেয়ার কত, ভিসার খরচ কত, ভিসা নিতে কত দিন সময় দরকার হয়, সেই দেশে দেখার মতো অংশ কয়টা এবং কি কি ইত্যাদি। এতে করে আমি টার্গেট করা দেশেগুলোর মধ্যে একটা যাচাই-বাছাই ধরনের তুলনা করে সিধান্ত নিতে পারি।
যাই হোক, আমার সেই তালিকার মধ্যে যেহেতু ফিলিপাইনও ছিল এবং এয়ার ফেয়ার খুঁজতে গিয়ে দেখলাম সিংগাপুর এয়ারলাইনসের ডিস্কাউন্ট চলছে তাই জুলাই এর ২৪ তারিখে টিকেট কিনে নিলাম।

এখানে দুটি উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে–
১. আমার সেই ছকে দেশ দেখার উৎকৃষ্ঠ সময় তালিকাভুক্ত ছিল না।
২. এয়ারলাইনসের ডিস্কাউন্টের নিয়ম মতো আমি তাদের কিছু নির্দিষ্ট তারিখের টিকেটেই মূল্যছাড় পেতে পারি!
এক্ষেত্রে আমার হাতে ১৫ দিনের ছুটি ছিল কিন্তু আমি অফারের তারিখ মিলিয়ে টিকেট কাটার কারণে ৯ দিন সময় পেলাম ফিলিপাইন ঘুরে দেখার জন্য।
সবচেয়ে কষ্ট সাধ্য পর্ব শুরু করলাম টিকেট কাটার পর থেকেই। মাথায় সারাক্ষণ একটাই চিন্তা, এতো বড় এবং সুন্দর একটা দেশের কোন অংশ দেখবো আর কি বাদ দিবো!? কেউ হয়তো আমার পরিকল্পনাকে ভুল বলতে পারেন আবার আমার মতোই যারা প্রতিটা মূহুর্তে বেঁচে থাকার আনন্দ খুঁজে বেড়ানোর শক্তি রাখেন তাদের জন্য এটাকেই যথোপযুক্ত মনে হবে।
এই কথা কেন বলছি তা হয়তো এখনো সবার কাছে পরিস্কার না। তাই আমি জানিয়ে রাখতে চাই যে, পুরো ভ্রমণ পরিকল্পনায় আমি এক রাতের বেশী কোথাও থাকিনি। সেই কারণে হয়তো খরচটা যেমন বেশী পরেছে আবার ঘুরাঘুরিও বেশী হয়েছে। এর পেছনে মূল কারণ হচ্ছে ফিলিপাইনে এটাই আমার প্রথম ভ্রমণ ছিল। তাই চেয়েছিলাম এক ঝলকে যতটা সম্ভব দেশটাকে দেখে নেয়া যায়। ফলে, পরবর্তীবার যেতে চাইলে কোন জায়গায় কতদিন দিনের জন্য যাবো সেটাও বুঝতে সুবিধা হবে।
জানিয়ে রাখার মতো আরও একটি বিষয় হলো, আমি কোন হোটেলে কোন রাতে থাকবো, সেই বুকিংগুলোও গুগলম্যাপ দেখে কনফার্ম করেই গিয়েছিলাম। অর্থাৎ যা কিছু দেখতে চাই এর আশেপাশেই থাকার চেষ্টা করেছি।
আমি আমার প্রতিদিনের ঘুরার একটা বিবরণ মোটামুটি ভাবে এখানে দিচ্ছিঃ

১ম দিনঃ
ফিলিপাইনে Davao শহরে প্রথম পা রেখেই যথারীতি দুটো কাজ করলাম- ১) ডলার এক্সচেঞ্জ করলাম, ২) মোবাইলের সিম নিলাম। এরপর গ্রাব এপ্স দিয়ে ট্যাক্সি ডেকে নিয়ে হোটেলে পৌছালাম। ছিমছাম সেই ডর্মের ভাড়ার নিয়মটা খুব ভালো লাগলো। ৫ ঘণ্টা অর্থাৎ শুধু রাতের জন্য কম খরচে থাকার সুযোগটাও আছে আবার ৮ ঘন্টা, ১২ ঘণ্টা অথাবা ২৪ ঘন্টা থাকলে সময় অনুযায়ী খরচ বাড়তে থাকবে। যদিও আমি Agoda থেকে বুকিং করেছি বলে এই কম খরচে থাকার এক রাত থাকার কথা জানতেই পারিনি।
সন্ধ্যায় শহরে নেমে রাতের মার্কেট দেখতে প্রথম গেলাম বিখ্যাত Abreeza Mall এবং তারপর Roxas Avenue Night Market, যেখানে পুরোটাই খাবারের বাজার। বিশাল সম্ভারের বৈচিত্রময় মুখরোচক খাবারের অভিজ্ঞতা নিয়ে রুমে ফিরে ঘুম দিলাম।

২য় দিনঃ
হোটেল থেকে পায়ে হাঁটার দুরুত্বে Lon Wa Temple দেখার মধ্য দিয়ে দিন শুরু করলাম। এরপর জীপনীতে অর্থাৎ আমাদের দেশের টেম্পু বা জীপ জাতীয় লোকাল গাড়িতে করে গেলাম People’s Park.
সেখান থেকে আবার জিপনীতে করে গেলাম Ramon Magsaysay Park। আমি কল্পনাই করি নাই একটা দেশ এত্তো সুন্দর ভাবে তাদের আদিবাসিদের জীবনযাপন পদ্ধতির সাথে দুনিয়ার পরিচয় করায়ে দেয়ার জন্য এতটাই পরিপূর্ণ ভাবে আয়োজন করা থাকতে পারে। ফিলিপাইনের বিলুপ্তপ্রায় আদিবাসিরাও এখানে তাদের নিজস্ব রীতিতে ঘর তৈরি করে সেখানে খাবার, পোশাক, গহনা, বাদ্যযন্ত্র, অস্ত্র ইত্যাদির প্রদর্শনী করছে! সবচে’ আশ্চর্যজনক ছিল কোন এক গোষ্ঠীর পরিবেশন করা কর্ণ কফি! আমার জীবনের অন্যতম এক অসাধারণ কফির স্বাদ পেলাম এখানে!
সেখান থেকে আরও কিছু বাজার, সমুদ্র সৈকত দেখে রুমে ফিরে ব্যাগ নিয়ে বিকালে আবার রওনা হলাম এয়ারপোর্টের দিকে, গন্তব্য ম্যানিলা।
ম্যানিলা পৌঁছে রাতের বাসে রওনা দিলাম Banaue Rice Terraces, Mountain Province, Ifugao- San Fernando এর দিকে।

৩য় দিনঃ
প্রায় ১০ ঘণ্টা রাতে বাস ভ্রমণের পর সকালের আলোতে মুগ্ধ হয়ে মেঘের ভেলায় নিজেকে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে হারাতে দেখলাম। আগে শুধু ছবি দেখেছিলাম এই অঞ্চলের, কিন্তু বাস্তবে সেটা আন্দাজ করতে পারিনি। Banaue Rice Terraces এ পাহাড়ের গায়ে চাষাবাদের কারুকাজ এরা কিভাবে করেছে তা দেখেই সারটাদিন পার করলাম।
প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো ওইদিন, দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি। বিকেলের দিকে খাবার খাবো ভেবে 7th Heaven’s Cafe তে কিছুক্ষণ বলসাম। বসে মনে হয়েছিল, মেঘের মধ্যে ভাসমান এই হোটেলের যথার্থই নাম দিয়েছে এরা। বাকীটা সময় এখানে বসে এরপর সন্ধ্যার বাসে ম্যানিলার দিকে যাত্রা করলাম।

৪র্থ দিনঃ
সকালে ম্যানিলা পোঁছে আবার বাসে চেপে বসলাম San Pablo City ‘র দিকে যাওয়ার জন্য, উদ্দেশ্য Villa Escudero তে পানির উপর ভাসমান রেস্তরায় বসে খাবার খাবো। জীবনে ছোট ছোট অনেক ইচ্ছা আমার, কিছু তো পূরণ করা যেতেই পারে।
১৮৮০ সালের ২০০০ একরের এলাকা জুড়ে এক রাজবাড়ীকে কেন্দ্র করে গড়া এই রিসোর্টর চারিদিকে ১ কিমি নারিকেল বাগানে ঘেরা। রেস্তরায় বসে খাবার আগে Escuderos পরিবারের একটা ছোট্ট জাদুঘর দেখে এলাম। আমি হতবাক হয়ে গেলাম শুধু তাদের সংরক্ষণ দেখেই! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান পর্যন্ত কি নেই তাদের? প্রতিটি শাসনামলের মুদ্রা, পোশাক, আসবাব, অস্ত্র এমনকি ওই রাজবাড়ীর প্রতিটি প্রাণীর শরীর সংরক্ষণ করেছে তারা। প্রজাপতি বা পোঁকামাকড়টাও বাদ পরেনি!
খেয়ে, বাঁশের নৌকা বেয়ে, ঘুরে ম্যানিলা ফিরে শুরু হলো আসল রোমাঞ্চকর ঝামেলা। রাস্তায় জ্যামের সাথে যুদ্ধ করে ফেরীঘাটে এলাম Coron Island যাবো বলে। ফেরীর টিকেট কাটা ছিল অনলাইনে। অথচ টাইফূনের কারণে তারা সব ফেরী বাতিল করেছে ওইদিন।
রাতে আমি ম্যানিলায় থাকতে চাই না। পরের দিনের জন্য রুম বুকিং তো দেয়াই ছিল এর উপর, ঐখানে গিয়ে যা কিছু দেখতে যাবো সেটাও মিস হয়ে যাবে।
অবস্থা বেগতিক দেখে এয়ারপোর্টে গেলাম। ম্যানিলা থেকে কোরন ফ্লাইটের অনেক দাম। তাই খুঁজে বেছে কম খরচের ভোর রাতের টিকেট কাটলাম, তবে তা ম্যানিলা থেকে না, ক্লার্ক শহর থেকে। যেখানে যাতায়াত করতে ম্যানিলা থেকে তিন ঘণ্টার মতো সময় বাসে জার্নি করতে হয়। আমার জন্য ভালোই হলো, রাতটা পার করা দরকার ছিল। তার উপর ক্লার্ক যাওয়ার জন্য এয়ারপোর্টের শ্যাটল বাস আছে দেখেই এই পথটা বেছে নিয়েছিলাম।
মধ্য রাতে ক্লার্ক এয়ারপোর্টে পৌঁছে ভোরের দিকে উড়াল দিলাম স্বপ্নের Coron Island এর পথে।

৫ম দিনঃ
শুরু হলো মাথা নষ্টের পালা। ভাষায় আমি কিছুই বলতে পারবো না। যাদের ধারণা নাই, তারা যে যার মতো গুগল সার্চ দিয়ে Coron কি জায়গার নাম তা দেখে নিতে পারেন।
আমি তো এতটাই হা হয়ে ছিলাম যে ঠিক মতো ছবিও তুলি নাই। কলিজা এই রকমই ঠাণ্ডা হয়েছে যে প্রেমে পরার পর মানুষের যেমন হয়…
সারাদিনের জন্য bangka বোটে করে Kayangan Lake, Barracuda Lake, Twin Lagoon, Siete Pecados, beach 91, Smith Beach, Coral Garden, Skeleton Wreck সবই দেখা হলো প্যাকেজের মধ্যে। এরা সীফুড লাঞ্চও রাখে তাদের প্যাকেজে এবং নৌকায় যেতে যেতে টাটকা সামুদ্রিক মাছসহ সব খাবার রান্না করতে থাকে।
এখানে মজাটা ছিল এমন যে, সারদিনের জন্য বিভিন্ন দেশের অজানা কিছু মানুষের সাথে খুব সুন্দর কিছু জায়গা দেখে বেড়াচ্ছি। ঢেউয়ের সাথে আমাদের রোমাঞ্চ বাড়ে আর জোড়ে বাতাস হলে আশঙ্কা। অচেনা এই মানুষগুলোর সাথে বাঁচা মরা কিছুক্ষণের জন্য একত্র হয়ে গেলো। সারাদিনের দুর্দান্ত ভ্রমণের পর রাতে একটা শান্তির ঘুম দিলাম।

৬ষ্ঠ দিনঃ
হাতে অল্প সময় অথচ দেখার এতো কিছু ভাবতেও কেমন যেন পিছুটান হচ্ছিল আমার। ১১ টার দিকের এয়ার টিকেট কাটা আছে El Nido যাবার জন্য। তারপরও ভোরে হোটেল থেকে বের হয়ে গেলাম Lualhati Park এবং সেখান থেকে Mt. Tapyas।
পাহাড়ের উপর থেকে দ্বীপ দেখার অভিজ্ঞতা যাদের আছে তারা হয়তো বুঝবে এটার সৌন্দর্য। কোন ছবি বা লেখার ভাষায় সেটা বুঝানো সম্ভব না। তারপরও কিছু ছবি আর বর্ণনা আমার ওয়ালের এই লিঙ্কে আছেঃ চাইলে কেউ দেখে নিতে পারেন https://www.facebook.com/shaima.siddika/media_set…
বেশী সৌন্দর্য দেখতে দেখতে যা হলো El Nido যাবার ফ্লাইটটাই ছুটে গেলো। এয়ারপোর্টে যাওয়ার পর জানলাম এয়ার সুইফটের এই ছোট বাহনটি এক ঘণ্টা আগেই দরজা বন্ধ করে। ডোমেস্টিক ফ্লাইটের এই ব্যবস্থা আমি এর আগে কোথাও দেখি নাই।
যাই হোক এরপর আবার গেলাম ফেরী ঘাটে। শীপের টিকেট কাটলাম El Nido এর জন্য। চার ঘন্টার পানি পথ। আসলে ওই যে একটা ফেরীর যাত্রা বাদ পরেছিল, তাই মনে খানিকটা আফসুস ছিল যে, এই দেশের ফেরীর অভিজ্ঞতা থাকবে না এটা কেমন কথা হলো? তাই হয়তো উপর থেকে বিশেষ ব্যবস্থা হয়ে এসেছে।
আরও মজা হলো যখন, ফেরী ঘাটে এসে ফেরীর অপেক্ষায় বসে ছিলাম, এমন সময় দেখি গতকালের চার জন ভ্রমণ সঙ্গীও এই ফেরীতে যাচ্ছে। সবাইকে আবার সবাই দেখতে পেয়ে খুব খুশী হলাম। এক জন আবার তথ্য দিলো আমি যেই ফ্লাইট মিস করেছি সেটায় করে একজন El Nido যাচ্ছে। মিনিট দশেক পর সেই যাত্রীও দেখি ঘাটে এসে দাঁড়ালো। এইবার আমাদের হাসি আর থামে না। দুইজনেরই প্লেন মিস হয়ে যাওয়াটা বড় বেশী কাকতালীয় ছিল, কিন্তু আমরা মনে হচ্ছিলো প্লান করেই সব করেছি।
বিকালে ফেরী থেকে ঘাটে নেমে গুগলে নিজের হোটেলের রাস্তাটা খুঁজতে গিয়ে মন অনেক বেশী ভালো হয়ে গেলো! পাঁচ মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ। হোটেলের পিছে আর পাশেই বড় বড় পাহাড় আর সামনের দিকে সমুদ্র। হোটেলের বারান্দায় দোলনায় বসে ভাবছিলাম আর কোথাও না গেলেও চলবে আমার।
তারপরও গেলাম বাইরে, এখানে পাশের দ্বীপ Lio Beach এ বেড়াতে যাওয়ার জন্য ফ্রী শ্যাটল বাস আছে। রাতে লাইভ গানের সাথে খাওয়া বা পার্টি করার জন্য যে কেউ যেতে পারে সেখানে। আমিও গেলাম, অবাক হয়ে দেখালাম। খানিকটা ঘুরে, পরের দিনের ট্যুর প্লান করে ফিরে এলাম রুমে।

৭ম দিনঃ
সকালে বারান্দায় বসে মেঘলা আকাশ দেখতে দেখতেই ট্যুর এজেন্ট ফোনে জানালো ঝড়ের জন্য ওইদিনের সব দ্বীপে যাবার অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। দিনের সব পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ায় সামান্য একটু মন খারাপ হলো তবে আমি বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নিতে সব সময় প্রস্তুত থাকি এবং কিভাবে সেই সময়কে কাজে লাগানো যায় তা ভাবতেও খুব বেশী সময় নেই না।
সাথেসাথেই বাইরে গিয়ে সারাদিনের চুক্তিতে বাইক ভাড়া করে নিয়ে চলে গেলাম জিপলাইনে পাহাড় থেকে পাহাড়ে ঘুরার জন্য। সেখান থেকে গেলাম Nacpan Beach, Duli Beach, Las Cabanas Beach, Corong Corong Beach সহ যতটুকু একদিনে দেখা যায় ঘুরে দেখার জন্য।
তারপর কোনমতে দৌড়ে গেলাম Puerto Princesa এর রাতের বাস ধরার জন্য।

৮ম দিনঃ
৫/৬ ঘণ্টার পথ শেষে কাক ডাকা সকালে বাস থেকে নামলাম। শহর ঘুরে দেখতে শুরু করলাম জিপনীতে বসেই। মাঝে দু’এক বার পছন্দ মতো জায়গায় নামলাম। দুপুরে আমার শেষ গন্তব্য তে যাওয়ার এয়ার টিকেট কাটা আছে, তাই খুব দূরে কোথাও গেলাম না।
প্রসঙ্গক্রমে এটাও বলতে চাই যে, জীবনে ঘুরতে গিয়ে যে কয়টা ভুল করেছি এই বারের যাত্রায় “এয়ার এশিয়া”র টিকেট কাটা তার মধ্যে ছিল একটা। আগেও ভারত এবং মালয়শিয়ায় গিয়ে ভুক্তভোগী হয়ে দেখেছি কিভাবে এদের পাবলিক বাসের মতো ফ্লাইটের সময় বদলায়। কিন্তু এয়ারটিকেট কাটার সময় সেই অভিজ্ঞতাটা কেন যেন মাথা থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল। এইবারের চরম ভোগান্তির পর এ জীবনে আর কোনদিন আমি এই ফ্লাইটের পথে যাবো না এটা নিশ্চিত।
দুপুর ২টার যাত্রা তারা শেষ করলো রাতে। Bohol Island এর রিসোর্টে আমার রাতের জন্য রুম বুকিং দেয়া ছিল। Cebu থেকে Bohol Island যাবার শেষ ফেরী ছেড়ে যায় সন্ধ্যা ৬ঃ৩০ তে অথচ প্লেন Cebu তে নামলো রাত ৮ঃ১০। রাতে Cebuতেই থেকে গেলাম।

৯ম দিনঃ
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফেরী ধরলাম Cebu থেকে Bohol যাবার জন্য। যেহেতু আগের রাতে না গিয়ে পরদিন সকালে যাচ্ছি তাই কিছু গন্তব্য বাদ দিয়ে কিছুটা যেন দেখে আসতে পারি সেই চেষ্টাই করলাম। শেষ বারের মতো পানির রঙে মাথা নষ্ট করতে গেলাম Panglao Island এর Alona Beachএ তারপর Balicasag Island, Bantayan Island আর Virgin Island এ।
আমি এতোটাই মুগ্ধ ছিলাম আর খুব বেশীক্ষণ না থেকেই ফিরে যেতে হবে এইসব ভেবে তেমন কোন ছবিই তুলতে পারলাম না! এবং মনকে বললাম, এই বার ছবি তুললে হয়তো আর কখনোই এখানে আসা হবে না। তাই ছবি তুলার জন্য হলেও আমার আবার এখানে আসতে হবে…
দেখার মতো অনেক কিছুই দেখে ফিরতে পারিনি, তারপরও মনের শান্তি নিয়ে ফিরেছি আমার শেষ দিনের যাত্রায়।

ফেরার দিনঃ
দিনের শুরুতে অল্প কয়েক ঘন্টায় সামান্য কিছু উপহার কিনে ফিরে এলাম রুমে। পাঁচ মিনিটের দুরুত্বে এয়ারপোর্ট তাই ঘন্টা খানেক আগেই চেক আউট করে এসে পরলাম। কোন মতে, তল্পিতল্পা নিয়ে সমেত ফিরে এলাম নিজের দেশে।
এবার একটা খরচের ধারণা দেই, যেটা অধিকাংশ মানুষের কাছে প্রাধাণ জ্ঞাতব্য বিষয় —
এবার একটা খরচের ধারণা দেই, যেটা অধিকাংশ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় জ্ঞাতব্য বিষয়। তবে কিছু খরচ এখানে আনুমানিক, কারণ ফিলিপাইনের মুদ্রাকে টাকার হিসাবে দেখানো হচ্ছে —

যাতায়াতের প্রধান খরচঃ
ঢাকা ফিলিপাইন (সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন) যাওয়া-আসাঃ ৩২,৬৪৮/-
Davao — Manila (এয়ার এশিয়া) ৩৮৫০/-
Manila — Banaue যাওয়া-আসা (লোকাল বাস) ১৬০০/-
Manila — San Pablo City যাওয়া-আসা (লোকাল বাস) ১০০০/-
Manila — Clark (এয়ারপোর্টের শ্যাটল বাস) ১০০০/-
Clark — Coron (ফিলিপাইন এয়ার লাইন) ৩৫০০/-
Coron — El Nido (ফেরী) ২২০০/-
El Nido — Puerto Princesa (লোকাল বাস) ৯০০/-
Palawan — Cebu (এয়ার এশিয়া) ২৫৫০/-
Cebu — Bohol Island যাওয়া-আসা (ফেরী) ২৫০০/-
জিপনীতে যেকোন জায়গায় যেতে প্রতি বার (প্রায়) ১৫/- অর্থাৎ মোট খরচ প্রায় ৫০০/-
অন্যান্য খরচঃ
Villa Escudero সারাদিনের ট্যুর প্যাকেজ ২৭০০/-
Coron এ সারাদিনের ট্যুর প্যাকেজ ২৮০০/-
El Nido তে সারাদিনের জন্য বাইক ১৩০০/-
Bohol Island এ ঘুরার জন্য নৌকা ভাড়া ২৫০০/-
আনুসাঙ্গিক যাতায়ত খরচ ৩০০০/-
খাওয়াঃ প্রতিদিন গড়ে ৪০০/- অর্থাৎ প্রায় ৩,৫০০/-
হোটেল খরচঃ
Davao City (Napsule Suites) ৭৫০/-
(https://www.agoda.com/napsule-suit…/…/all/davao-city-ph.html)
Coron (Happiness Hostel) ৮০০/-
https://www.agoda.com/sea-horse-guest-hou…/…/palawan-ph.html
El Nido (Happiness Hostel) ১২৪০/-
https://www.agoda.com/happiness-hostel/hotel/palawan-ph.html
Cebu (Jiji’s Hostel) ১৭২০/-
https://www.agoda.com/jiji-s-hostel/hotel/cebu-ph.html
সর্বমোটঃ প্রায় ৭৩,০০০/- টাকা

ভ্রমণের ক্ষেত্রে কিছু টাকার গচ্ছা যাওয়া অস্বাভাবিক ঘটনা না, আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। আমি যেই হিসেবটা এখানে দেইনি। তবে ঐযে শুরুতে বলেছিলাম আমার ছকে যেকোন দেশ দেখার উৎকৃষ্ট সময়ের উল্লেখ নেই তাই গচ্ছাটা তুলনামূলক ভাবে বেশীই হয়েছে। যেটা সঠিক সময়ে ওই দেশে গেলে আরও কম হতে পারতো। আর ইচ্ছা করলে আমি এই দেশে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যেই এই ৯ টা দিন ঘুরে ফিরে নিতে পারতাম। কিন্তু এই পাগলামিটা করে যেই শান্তি পেয়েছি সেটা আর পেতাম না।
সবশেষে এটুকুই বলবো, আমি যেহেতু খুব বেশী ছবি তুলি নাই, তাই আমার বিশদ বর্ণনার পর যদি এই জায়গায় কেউ যেতে চায়, তাহলে যাবার আগে বাস্তব চিত্র দেখতে গুগল করে আসলেই এই জায়গাগুলো কতটা সুন্দর দেখে নিতে পারেন।

Source:  Shaima Siddika‎< Travelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment

Shares