বাংলাদেশে মধুচন্দ্রিমা/হানিমুন করার সেরা ৯টি স্থান

বাঙ্গালি সংস্কৃতিতে একটা রেওয়াজ আছে, শীত এলে বিয়ের ধুম লাগে। আর মধুচন্দ্রিমা, বিয়ে পরবর্তী এমন এক আয়োজন, যা নব দম্পতির মানসিক বোঝা-পড়ায় বেশ অবদান রেখে থাকে। মধুচন্দ্রিমা এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি এখন বিয়ে পরবর্তী গোছানো জীবনের অনুষঙ্গ। আর্থিক সামর্থের উপর নির্ভর করে প্রেয়সীর হাতে হাত রেখে দু-চারটা দিন কোথায় কাটাবেন, দেশে না বিদেশে?
আমাদের এই সুজলা-সুফলা, শ্যামল-সুন্দর বাংলাদেশেই রয়েছে অনেক অনেক সুন্দর জায়গা। এরকম অনেক অনেক সুন্দরতম আকর্ষণীয় জায়গার মধ্যে মাত্র নয়টি জায়গার নাম দেওয়া হলঃ

১। কক্সবাজার: মধুচন্দ্রিমা উৎযাপনের জন্য দেশের মধ্যে সর্ব প্রথম যে জায়গাটির কথা আসবে তার নাম হল কক্সবাজার। প্রেয়সীর হাতে হাত রেখে গল্প আর খুনসুঁটি করার ছলে দৌড়ে বেড়ানোর মত চমৎকার এক সাদা বালির সৈকত। জোয়ারে মন মাতিয়ে তুলবে আর ভাটার সময় যত দূর চোখের দৃষ্টি যায়, শুধুই দেখা যাবে হাজারো লাখো ছড়িয়ে থাকা প্রবাল, জীবন্ত সেই প্রবাল পাথরে বসে শুভ্র ফেনা তোলা ঢেউয়ে পা’দুলিয়ে ভেজাতে ভেজাতে করে নিন আগামী দিনের সাংসারিক পরিকল্পনা।

২। সেন্টমার্টিন: বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। স্থানীয়রা নারিকেল জিঞ্জিরা নামেও ডেকে থাকেন। কারণ সেখানে রয়েছে প্রচুর নারিকেল গাছ। জোছনা রাতে সেই গাছের নিচে বসে ঝিরঝির বাতাস আর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে – নব বধুর কোলে মাথা রেখে, নানান গল্পে মেতে থাকার মুহুর্তগুলো আজীবন স্মরনীয় হয়ে রবে।

৩। সাজেক ভ্যালি: তৃতীয় যে জায়গাটি মধুচন্দ্রিমা উৎযাপনের জন্য স্মৃতির আঙ্গিনায় জলজল করবে তা হলো বর্তমানে সেরা পর্যটন স্পট – ঢেউ খেলানো পাহাড়ের গায়ে গড়ে তোলা সাজেক ভ্যালি। যারা কিছুদিন হল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু ঠিক করেননি কোথায় যাবেন মধুচন্দ্রিমা উৎযাপনে, তারা আর অন্য কোথাও চিন্তা না করে ছুটে যান রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ভ্যালি। সাজেকের বর্ণনা আমি না হয় নাই দিলাম। আপনি নিজে গিয়েই দেখুন না সাজেকের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর মিজোরাম পাহাড় থেকে জেগে উঠা সূর্যোদয়!

৪। নেত্রকোনা: ইতিহাস ঐতিহ্য ও প্রকৃতির রানী নেত্রকোনা। মধুচন্দ্রিমার রোমাঞ্চ করতে গিয়ে কেউ আর ইতিহাস ঐতিহ্যের খোঁজ করবে না। করারও কথা না, তাই তাদের জন্য নেত্রকোনা জেলার সু-সং দূর্গাপুর হল বেষ্ট হিট। সোমেশ্বরী নদীর পাড়ে কিংবা চিনামাটি পাহাড়ের পাদদেশে, একান্তে দুজনে কাটিয়ে দিন না অনেকগুলো সোনালি সময়।

৫। শ্রীমঙ্গল: মৌলভী বাজার জেলার চা পাতার দেশ শ্রীমঙ্গল। চা বাগানের মাঝে কোন রিজোর্টের ব্যালকানিতে কিংবা খোলা প্রান্তরে দুজন দুজনার হয়ে যাবার জন্য রয়েছে বেশ সুযোগ, আরো রয়েছে নীলপদ্ম ফোঁটা প্রকৃতির অপার নিয়ামত মাধবপুর লেক। যেখানে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা প্রেয়সীর সান্নিধ্যে কাটিয়ে দিন নিশ্চিন্তে।

৬। ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন: কোলাহল থেকে অনেক দূরে ঘুরে আসুন সুন্দরবনের হিরণ পয়েন্টে। মধুচন্দ্রিমা উৎযাপনের সময়গুলোতে মন চাইবে না আর ফিরে আসি শব্দ দূষণের ঘিঞ্জি শহরে। দিনের আলোতে ঘুরে বেড়াবেন কেওড়া বনে আর পূর্ণিমার আলোতে রেষ্ট হাউসের বারান্দাতে মজার মজার সব গল্প বলে।

৭। নিঝুমদ্বীপ: কেওড়া ও গোলপাতার ছায়ায় নব বধুকে আলিঙ্গন করে রাখুন সারাক্ষণ। বনের হরিণও আপনাদের দুজনের আনন্দঘন মুহূর্তের ছন্দপতনে ভূমিকা রাখবে না। শুধুই হবেন দুজন দুজনার। আর এমন পরিবেশেই গড়ে তোলা যায় ভবিষ্যৎ সংসারের ভিত্তি।

৮। রাঙ্গামাটির জুড়াছড়ি: আজকাল অনেক দম্পতি আছেন যারা ব্যক্তি জীবনে এ্যাডভ্যাঞ্চার ট্রাভেল করতে পছন্দ করেন তাদের জন্য জুড়াছড়ি একের মাঝে দুই। মেঘ যেখানে পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে অলস সময় কাটায়! ভাবুন’ত একবার, অমন জায়গায় মধুচন্দ্রিমার রোমাঞ্চের মাত্রাটা কেমন হতে পারে?

৯। বান্দরবানের তিন্দু: তিন্দুর উপমা শুধু তিন্দুই। পাহাড়ি খরস্রোতা নদী শঙ্খর স্বচ্ছ জলে রাত শেষে যখন কাকডাকা ভোরে ডুব দেবেন – তখন মনে হবে মধুচন্দ্রিমায় তিন্দু আসায়, দুজনের বন্ধন যেন হয়ে গেল চির অটুট।

যোগাযোগ ও থাকা-খাওয়া: নিঝুমদ্বীপ যেতে হলে সড়ক ও নৌপথে হবে,তবে নৌপথে বেশ নিরাপদ। সদরঘাট থেকে প্রতিদিন জাহাজ ছেড়ে যায় নোয়াখালীর হাতিয়া, সেখানে থেকে ট্রলারে নিঝুমদ্বীপ। থাকা খাওয়ার জন্য থাকুন নিশ্চিন্ত। বান্দরবানে যেতে হলে ঢাকা থেকে বান্দরবানের বিভিন্ন পরিবহনের এসি/ নন এসি বাস সার্ভিস রয়েছে।

বান্দরবানের শহর থেকে লোকাল বাস/জিপে থানচি। থানচি বাজার হতে ট্রলারে তিন্দু। থাকা খাওয়ার জন্য কটেজ রয়েছে। ভাড়া সহনীয়। জুড়াছড়িতে যেতে হলে ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটি; এরপর শহরের রিজার্ভ বাজার হতে জাহাজে জুড়াছড়ি। থাকা খাওয়া আদিবাসিদের ভাড়া দেয়া ঘরে। পাহাড় ঘেরা ছোট্ট ঘরে মধুচন্দ্রিমার রোমাঞ্চ হয়ে উঠবে ষোল কলায় পূর্ণ। সুন্দরবনের ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে মংলা, বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে জালি বোটে হিরণ পয়েন্টে।

সাজেক ভ্যালিতে যেতে হলে ঢাকা থেকে শান্তি পরিবহনে খাগড়াছড়ির দিঘীনালা। সেখান থেকে জীপে / মটর বাইকে অপরুপ সাজে সাজানো সাজেক ভ্যালি। নেত্রকোণার ক্ষেত্রে ঢাকার মহাখালি হতে সূসং-দূর্গাপুরের বাসে। সময় লাগবে মাত্র পাঁচ ঘন্টা। থাকবেন জেলা পরিষদের ডাকবাংলো সহ ওয়াই এম সিতে। খাবেন লাল বিড়ই চালের ভাত আর সোমেষ্বরী নদীর মাছের ঝোল দিয়ে।

সেন্ট মার্টিনে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফ, বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস রয়েছে। টেকনাফ থেকে জাহাজে চড়ে স্বপ্নের আঙ্গিনা কোরাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন চলে যান। চাইলেই কটেজের রাধুঁনী শিল্পীদের দিয়ে, নানান পদের সামুদ্রিক মাছ রান্না করিয়ে, স্বাদ নিতে পারবেন।
শ্রীমঙ্গলের ক্ষেত্রে বাস ও ট্রেন দুটোই চলাচল করে। তবে ট্রেনে চড়ে চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গলে যাবার অনুভূতিই হবে অন্যরকম। থাকবেন-খাবেন, লাউয়াছড়া বনের পাশে গড়ে উঠা আনন্দবাড়ি সহ বেশ কিছু কটেজে। তবে যেখানেই থাকুন কেন হাঁসের গোস্তের ঝাল ঝোল দিয়ে-চিতই পিঠা আর নীল কন্ঠের সাত রঙ্গের চা পান করতে ভুল যেন না হয়।

খরচপাতি: নয়টি জায়গার মধ্যে- চারটি বাদ দিলে বাকি পাঁচটি জায়গায়, এক সপ্তাহ মধুচন্দ্রিমায় খরচ হবে বার থেকে পনের হাজার টাকা মাত্র। কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন,সাজেক ও শ্রীমঙ্গল এই চারটি জায়গায় খরচের লাগাম নিজেকেই টানতে হবে। এক সপ্তাহ মোটামুটি ভাবে কাটাতে চাইলে নুন্যতম পঞ্চাশ থেকে এক লাখ টাকা খরচ হবে।

Share:

Leave a Comment

Shares
error: Content is protected !! --vromonkari.com