ভারতের মহারাষ্ট্র-এর কিছু অংশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা

অনেকদিন ধরেই লিখবো লিখবো ভাবছি কিন্তু লেখা হচ্ছে না। আজ একটু চেষ্টা করছি লেখার।
ঘুরতে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমার মতো অনেকেরই প্রথম পছন্দ ভারত। গ্রুপে ইন্ডিয়া ভ্রমণের অনেক গল্প দেখি, খুব ভালো লাগে পড়তে। কিন্তু, যে যায়গাটি নিয়ে কখনো কাউকে লিখতে দেখিনি, আজ সেই আওরঙ্গাবাদ ভ্রমণের কথাই লিখবো। ট্যুরটি ২০১৭ তে দিয়েছিলাম, অনেক কিছু ভুলে গেছি, তাই খরচ সংক্রান্ত বিষয়টি উল্লেখ থাকছে না এ লেখায়। বলে রাখা ভালো এটি ছিল আমাদের একটি সলো ট্যুর। আর আমাদের টিমে ছিল ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ১৬ জন।

আওরঙ্গাবাদ
মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেব যখন দাক্ষিণাত্যের শাসনকৰ্ত্তা ছিলেন, তখন তিনি এই আওরঙ্গাবাদ শহরটি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এবং নিজের নামেই এর নামকরণ করেছিলেন ‘আওরঙ্গাবাদ’। আওরঙ্গাবাদকে বলা হয় ‘দি সিটি অব গেইট’। শহরটিতে রয়েছে অনেকগুলো প্রবেশপথ এবং প্রতিটিতে মোঘল ’তোরণদ্বার ‘ আছে। কসময়ে মোট ৫২ টা দ্বার থাকলেও বর্তমানে ছোটবড় মিলিয়ে মাত্র ১৩ টাই অবশিষ্ট আছে । এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে পুরনো হল ‘ভাদকাল দ্বার’ । আসলে দাক্ষিণাত্যে শাসনব্যবস্থা জোরদার করার জন্য আওরঙ্গজেব যখন এখানে থাকা শুরু করেন তখনই নিরাপত্তার কারণে পুরো শহরটাকে পাঁচিল দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় । সেই পাঁচিলের মাঝেই এই গেটগুলো । এখন অবশ্য পাঁচিলের খুব সামান্যই অবশিষ্ট আছে । তবে শহরটির সর্বক্ষেত্রে এখনও সেই প্রাচীন মোগল নগরীর বিশেষত্বের ছাপ সুস্পষ্ট লেগে রয়েছে দেখা গেল।

প্রথম দিন:
আওরঙ্গাবাদ আমরা দুইদিন ছিলাম এবং পুরোটা সময় আমরা ঘুরেই কাটিয়েছিলাম। শহরে ঢুকে প্রথমেই আমরা হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে তারপর গাড়ি ঠিক করলাম ২ দিনের জন্য। এরপর খাওয়া-দাওয়া সেরে প্রথম দিন গেলাম ৫টি স্পটে। সেগুলো হলো:
১। সেনেরি মহল
২। আওরঙ্গাবাদ ইউনিভার্সিটি
৩। আওরঙ্গাবাদ কেভ
৪। বিবি-কা-মকবরা
৫। পান চাক্কি

সোনেরি মহল
সেনেরি মহল এর নামকরণ হয়েছে মূলত এই মহলে সোনা রঙের নকশার জন্য। এ মহলটি “গোল্ডেন প্লেস” নামেও পরিচিত। মহলটি এক সময় পুরো সোনার রঙ্গে রাঙ্গোনো ছিল। যদিও কালের বিবর্তনে সেই রঙ্ এখন বিলীন হয়ে গেছে। দুই তলা এই মহলটিকে কখনো কখনো সম্রাট আওরঙ্গাবাদের সময় দরবার হল হিসেবে ব্যবহার করা হতো। পরিপাটি এই মহলটিতে ঢুকতে গেলে এর তোরণটি দেখেই অনুমান করা যায় তখনকার পরিস্থিতি। যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য উপযুক্ত করে বানানো তোরণটি এখোনো সে সময়টি যেন ধরে রেখেছে। এটি একটি আয়তক্ষেত্রাকার দরজা । তোরণটিকে হাতীখানা বলা হয় যার অর্থ হাতির স্থান। তোরণটি ইসলামিক স্টাইলের তোরণ মত করে তৈরি করা হলেও মহলটি তৈরি হয়েছে রাজপুত স্টাইলে। মূল ত্বোরণ দিয়ে ঢোকার পরই একটি সুন্দর বাগান ও এই একটি ফোয়ারা দেখা যায়। যদিও এখন ফোয়ারাটিতে কোন পানি্ই নেই। এই প্রাচীন ঐতিহাসিক মহলটি এখন যাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ভারতীয় প্রাচীন পোশাক, মোঘলদের প্রতিদিনের ব্যবহারের প্রাচীন জিনিসগুলির রাখা রয়েছে। এছাড়াও স্থানীয় খননকার্য থেকে বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য এবং ত্রাণ প্রদর্শন করা হচ্ছে।

আওরঙ্গাবাদ ইউনিভার্সিটি
সেনেরি মহল থেকে বেরিয়ে আমরা গেলাম আওরঙ্গাবাদ ইউনিভার্সিটিতে। বিশ্ববিদ্যালয়টির আসল নাম ডাঃ বাবাসাহেব আম্বেদকর মারাঠওয়াদা বিশ্ববিদ্যালয় । পাহাড়ের পাদদেশে ৭২৫ একরেরও বেশি এলাকা নিয়ে তৈরি এ ইউনিভার্সিটিটি মূলত সোনেরি মহলের গাঁ ঘেষেই নির্মিত হয়েছে। আর এর উত্তর দিকে রয়েছে ‘বিবি-কা-মকবরা’। মনোরম পরিবেশ, চমৎকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তার। তবে খুব বেশি সময় দিতে পারিনি ওখানে।

আওরঙ্গাবাদ কেভ
এরপর গেলাম আওরঙ্গাবাদ কেভে। এই গুহাতো ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত। ১০টি গুহা দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রয়েছে এখানে। খুবই সুন্দর লাগছিল গুহা ও এর আশেপাশের অবস্থান। পাহাড় কেটে বানানো বলেই একটা শীতল হাওয়া বইছিল পুরোটা সময় জুড়ে। এই গুহার উপর দাড়িয়ে পরো আওরঙ্গাবাদ শহরটি দেখা যায়।

বিবি-কা-মকবরা
শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বিবি-কা-মকবরাকে বলা হয় ’ছোট তাজমহল ’বা ’মিনি তাজমহল’ । তাজমহলের আদতেই তৈরী করা বলেই হয়তো একে ছোট তাজমহল বলা হয়। এটি মূলত সম্রাট আওরঙ্গজেবের চতুর্থ স্ত্রী বেগম রাবিয়া-উদ-দুররানির সমাধি। গাইড জানালেন, বিবি-কা-মকবরার প্রধান স্থপতি উস্তাদ আতা উল্লা।
মূলত ‘বিবি কা মাকরাবা ‘আগ্রার তাজমহলের অনুপ্রেরণায় নির্মিত করেন সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র আজম শাহ। বিবি-কা-মক্‌বারা দেখতে অনেকটাই তাজমহলের মতো তবে আকারে কিছুটা ছোট । আর তাজমহলের সঙ্গে এর পার্থক্য হল এটা তাজমহলের মতো পুরোপুরি মার্বেল দিয়ে তৈরি নয়, নিচের দিকে কিছুটা মার্বেল দেওয়ার পর ওপরের দিকটা রঙ করা । নির্মানকালে আজম শাহর লক্ষ্য ছিল সৌন্দর্যে তাজমহলকেও ছাড়িয়ে ‘বিবি কা মাকবারা’ কে নির্মান করা। কিন্তু দাদা শাহজাহানের ন্যয় যথেষ্ঠ রাজকোষ কিংবা দক্ষ শ্রমিক না থাকায়, সৌন্দর্যে তাজমহলের চেয়ে অনেকটা মৃয়মান অবস্হায় নির্মিত হয় এই বিবি কা মাকবারা। তাছাড়া আজম শাহর বাবা মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের স্হাপত্যের দিকে খুব একটা আগ্রহ ছিল না। এমনকি প্রাথমিক অবস্হায় আওরঙ্গজেব তাজমহলের ন্যায় আরো একটি ব্যয়বহুল স্হাপনা নির্মিতে আগ্রহী ছিলেন না। এবং এই স্থাপনা যাতে না হতে পারে সেইজন্য তিনি রাজস্হান এবং মোঘল সাম্রাজ্যের অন্য বিভিন্ন স্হান থেকে পাথর পরিবহন করা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেন। তবে মায়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে তাজমহলের চেয়েও সুন্দর একটি স্হাপনা তৈরী করতে আজম শাহ এতটাই আগ্রহী ছিলেন যে বাবা আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে মামলা করে জয়ী হয়ে এই বিবি কা মাকবারা নির্মান কাজ শুরু করেন। ১৮০৩ সালে নিজাম সিকান্দার জাহান যখন আওরঙ্গাবাদ ও মারাওয়াডায় রাজত্ব করেছিলেন, তখন তিনি বিবি কা মাকবারার সৌন্দর্যে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন, তিনি মহলটি তার রাজধানী হায়দ্রাবাদে তা উঠিয়ে নিয়ে আসতে বলেন। তিনি মহলের একটি একটি করে স্লাব উঠিয়ে আনতে আদেশ দেন। তবে পরবর্তীতে কোন এক অজানা কারনে তিনি এটি করেননি, বরং পরবর্তিতে মূল কাঠামোর পশ্চিমে একটি মসজিদ নির্মান করেন তিনি।

পান চাক্কি
বিবি-কা-মকবরা দেখার পর গেলাম পান চাক্কি দেখতে। পান চাক্কি মূলত পানির কল হিসাবে পরিচিত। চরকার মত একটি বড় চাকা ঘুরছে দিবা রাত্রি। এটি পানি পরছে চমৎকার গতিতে। এটি মধ্যযুগীয় ভারতীয় স্থাপত্যের মধ্যে প্রদর্শিত বৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রক্রিয়াটি প্রদর্শন করে। এটি একটি পাহাড়ের থেকে নেমে আসা পানির মাধ্যমে শক্তি উত্পাদন করার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। সূফী সাধক বাবা শাহ শাহ মুসাফিরের দরগাহের পাশে সংযুক্ত এই বিল্ডিংটি ‘মাহমুদ দরওয়াজার’ নিকটে একটি বাগানে অবস্থিত। এতে একটি মসজিদ, একটি মাদ্রাসা, একজন মন্ত্রীর বাড়ি, সরাই এবং পুকুরের মত দুটি বড় বড় চৌবাচ্চা। একটি আবার ছাউনি দেখা। নামাজের আগে মুসল্লিরা এখানে বসে ওজু করেন। এখানে একটি মসজিদও আছে। সেই সাথে আছে মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সূফি ধর্মগুরু বাবা শাহ মুসাফিরের সমাধি।
এখান থেকে বের হয়ে আমরা শপিং করলাম কিছু। এরপর হোটেলে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে হোটেলের আশেপাশে ঘুরলাম। টুকটাক কেনাকাটা করলাম। বলে রাখা ভালো যে, আওরঙ্গাবাদে ফল বেশ সস্তা। সারা পথে আমরা বেদানা/ডালিম বাগান, মাল্টার বাগান দেখেছি। তাই বেশ কিছু টাটকা ফল আমরা কিনে নিয়েছিলাম স্থানীয় একটি বাজার থেকে। এরপর হোটেলে ফিরে রাতে খেয়ে পরের দিনের প্লান করে ঘুমিয়ে পরলাম।

Source: Farhana Zaman Liza‎<Travelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment

Shares