মুন্সীগঞ্জের আকর্ষণীয় সব জায়গার বৃত্তান্ত

আমাদের এবারের ট্যুরে আমরা চলে আসলাম মুন্সীগঞ্জ। মুন্সীগঞ্জে দেখার মত অনেক কিছু থাকলেও আমরা আমাদের একদিনের এই ট্যুরে অল্প কিছু জায়গা দেখলাম।

♣️ নাটেশ্বরে হারিয়ে যাওয়া উন্নত নগর সভ্যতার নিদর্শন।

** প্রথমেই আমরা চলে আসি নাটেশ্বর প্রত্নতাত্তিক খননকৃত বৌদ্ধ মন্দির ও স্তুপ দেখতে। টংগিবাড়ী উপজেলার সোনারং টংগিবাড়ী ইউনিয়নের নাটেশ্বর গ্রামে ২০১৩ এবং ২০১৪ সালের প্রত্নতাত্তিক খননে আবিস্কৃত হয় মন্দির এবং স্তুপ স্থাপত্যের অংশবিশেষ।

আবিষ্কৃত হয়েছে – অসাধারণ বৌদ্ধ মন্দির, তিনটি অষ্টোকোণাকৃতির স্তুপ, পিরামিড আকৃতির বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ স্তুপ, কেন্দ্রীয় মন্দির, হাজার বছর আগের রাস্তা, নালা প্রভৃতি ।মুন্সীগঞ্জের অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে জাহাঙ্গীরনগর ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা প্রত্নখনন কাজ করেন।

♣️ বিক্রমপুর বৌদ্ধ বিহার, রঘুরামপুর

** আমরা নাটেশ্বর ঘুরে চলে আসলাম রঘুরামপুরে অবস্থিত বিক্রমপুর বৌদ্ধ বিহার দেখতে। বিক্রমপুর বিহার হলো বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার, বিক্রমপুরের অন্তর্গত রঘুরামপুর গ্রামে অবস্থিত একটি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার।

এটি মহারাজ ধর্মপালের শাসনামলে নির্মিত ৩০টি উল্লেখযোগ্য বিহারের মধ্যে অন্যতম। ধর্মপাল ছিলেন পাল সম্রাজ্যের দ্বিতীয় সম্রাট। ঐতিহাসিকভাবে এই মঠটি, অতীশ দীপঙ্করের সাথে সম্পর্কিত, যিনি তিব্বতী বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। অতীশ দীপঙ্করের জীবদ্দশায়, এই অঞ্চলটি ছিল বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষার কেন্দ্রবিন্দু এবং চীন, তিব্বত, নেপাল ও থাইল্যান্ডের মত দূরবর্তী অঞ্চল থেকেও প্রায় ৮০০০ অধ্যয়নকারী ও অধ্যাপক এখানে অধ্যাপনা করতে আসতেন। অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন কর্তৃক চালানো দীর্ঘ ৪ বছরব্যাপী এক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের পর ২০১৩ সালের ২৩শে মার্চ তারিখে, অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ যৌথভাবে এই নিদর্শনটি আবিষ্কারের ঘোষণা দেয়। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এই প্রত্নতাত্ত্বিক খননের জন্য অর্থের যোগান দেয়।

♣️ মুক্তারপুর সেতু

আমরা রঘুরামপুরের বৌদ্ধ বিহার ঘুরে চলে আসি মুক্তারপুর সেতুতে, এটি ঘুরে দেখার জন্য এবং কিছু সময় কাটানোর জন্য।

ষষ্ঠ বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু মুন্সিগঞ্জ জেলার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ন সেতু। এটি ৬ষ্ঠ মুক্তারপুর সেতু নামেও পরিচিত। মুন্সীগঞ্জ জেলা সদর থেকে প্রায় চার কিমি দূরে মুক্তারপুর নামক স্থানে ধলেশ্বরী নদীর উপর দিয়ে নির্মিত এ ব্রীজটি ঢাকা, নারায়নগঞ্জ এবং মুন্সীগঞ্জ এর যোগাযোগ ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ন মাইলফলক।

♣️ ইদ্রাকপুর কেল্লা

মুন্সীগঞ্জ শহরে অবস্থিত একটি মোঘল স্থাপত্য। বাংলার সুবাদার ও সেনাপতি মীর জুমলা ১৬৬০ খ্রীস্টাব্দে বর্তমানে মুন্সীগঞ্জ জেলা সদরে ইদ্রাকপুর নামক স্থানে এই দুর্গটি নির্মাণ করেন। দুর্গটি নারায়নগন্জের হাজীগঞ্জ ও সোনাকান্দা দুর্গের চেয়ে আয়তনে কিছুটা ছোট। এই দুর্গটি তৎকালীন মগ জলদস্যু ও পর্তুগিজ আক্রমণের হাত থেকে ঢাকা ও নারায়নগঞ্জসহ সমগ্র এলাকাকে রক্ষা করার জন্য নির্মিত হয়।

সুরঙ্গপথে ঢাকার লালবাগ দুর্গের সাথে এই দুর্গের যোগাযোগ ছিল বলে একটি জনশ্রুতি প্রচলিত আছে। সুউচ্চ প্রাচীরবিশিষ্ট এই দুর্গের প্রত্যেক কোনায় রয়েছে একটি বৃত্তাকার বেষ্টনী।

দুর্গের ভেতর থেকে শত্রুর প্রতি গোলা নিক্ষেপের জন্য প্রাচীরের মধ্যে অসংখ্য চতুষ্কোনাকার ফোঁকর রয়েছে একমাত্র খিলানাকার দরজাটির অবস্থান উত্তর দিকে। মূল প্রাচীরের পূর্ব দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে একটি গোলাকার উঁচু মঞ্চ রয়েছে। দূর থেকে শত্রুর চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য প্রায় প্রতি দুর্গে এই ব্যবস্থা ছিল। এই মঞ্চকে ঘিরে আর একটি অতিরিক্ত প্রাচীর মূল দেয়ালের সাথে মিলিত হয়েছে। দুর্গের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সূদৃঢ় করার জন্য এটি নির্মিত হয়েছিল। কেল্লাটির তিন কিলোমিটারের মধ্যেই ইছামতী, ধলেশ্বরী, মেঘনা এবং শীতলক্ষা নদীর অবস্থান। মোঘল স্থাপত্যের একটি অনন্য কীর্তি হিসেবে ইদ্রাকপুর দুর্গটি ১৯০৯ সালে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষিত হয়।

♣️ অতীশ দীপঙ্করের বাস্তুভিটা

অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান হলেন একজন প্রখ্যাত পণ্ডিত যিনি পাল সাম্রাজ্যের আমলে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং বৌদ্ধধর্মপ্রচারক ছিলেন। তিনি ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বিক্রমপুর পরগনার বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত। তার জন্মস্থানের বাস্তুভিটাকে এখনো স্থানীয় জনগণ ‘পণ্ডিতের ভিটা’ বলে অভিহিত করে।

♣️ আমরা আমাদের মুন্সীগঞ্জ ভ্রমণে এই কয়টি জায়গা ঘুরে দেখলাম। যদিও মুন্সীগঞ্জে দেখার মত আরো অনেক জায়গা আছে, কিন্তু আমরা একদিনে সব না দেখে পরবর্তীতে সে দেখার জন্য কিছু রেখে গেলাম। এগুলো ঘুরে দেখে আমরা চলে আসি মাওয়া ঘাটে। কিছুক্ষণ এখানের সৌন্দর্য উপভোগ করে আমরা ঘাটের পাড়ের হোটেল থেকে ইলিশ ভাজা দিয়ে দুপুরের খাবার শেষ করি, যদিও ততক্ষণে বিকেল হয়ে গেছে।

♣️ মুন্সীগঞ্জ আসতে চাইলে ঢাকার গুলিস্থান থেকে বাসে করে সরাসরি মুন্সীগঞ্জ সদর আসা যায়। এরপর অটো নিয়ে সব গুলো জায়গা ঘুরে দেখা যাবে। মুন্সীগঞ্জ সদরেই রয়েছে ইন্দ্রাকপুর কেল্লা, তাই এটি আগে দেখে নেয়া ভালো।

♣️ বিঃ দ্রঃ যেখানেই যান সেখানকার পরিবেশ যেন নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবেন।। ময়লা নির্ধারিত স্থানে ফেলুন। আর অনেক বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করে এই জায়গা গুলো, তাই এখানকার পরিবেশ রক্ষায় সচেতন থাকবেন সবাই।

Source: Rafi Hassan‎<Bangladesh Travel Group (BTG)

Share:

Leave a Comment

Shares
error: Content is protected !! --vromonkari.com