শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ আন্দামান ভ্রমন

ভোরে উঠেই বিচে গেলাম সূর্যোদয় দেখতে।ছেলে আর তার বাবাকে উঠানো যায়নি তাই একাই গেলাম। ৫.৪০ এ নাকি সূর্যোদয়। শান্ত, স্নিগ্ধ পরিবেশ।
অদ্ভূত! আস্তে আস্তে তিনি পূর্ব দিগন্তে উদিত হচ্ছেন। আকাশ লালচে।কিন্তু আফসোস! মেঘের কারনে ভালো দেখা গেল না।তবুও অপূর্ব সৌন্দর্য! কিছুক্ষন পানিতে পা ভিজিয়ে হেঁটে বেড়ালাম।ঝিনুক কুঁড়ানো নিষেধ আন্দামানে।নাহলে কুঁড়াতাম নিশ্চয়।ছোট ছোট শামুক বালিতে হেঁটে বেড়াচ্ছে।কিছুক্ষন পর ছেলে আর বাবা আসলো।ছেলে নেমে গেল পানিতে।বালিতে প্রাসাদ বানাতে লাগলো। আমরা দুজন পাশাপাশি হাটলাম কিছুক্ষন।সময় যেন স্থির।মাত্র ৬টা বাজে।আন্দামানে একটা মজার বিষয় হলো খুব তাড়াতাড়ি দিন শুরু হয়।৭/৮ তে মনে হয় ১১টা।রোদ উঠে খুব আর গরম।রাত ও খুব তাড়াতাড়ি হয়। ৬ টার পর অন্ধকার।আর খুব নিরাপদ জায়গা।কোন চুরি, ছিনতাই বা অন্য কিছুর ভয় নেই।

সাড়ে সাতটায় রিসোর্টের সামনের চায়ের দোকানে বলে অর্ডার দিলাম লুচি সব্জির।ওদের রেস্টুরেন্ট আছে ওখান থেকে আসবে।পাশেই শাকাহারি রেস্তোরা ছিল, কিন্তু খুলেনি।আমাদের আবার ৮টায় গাড়ি আসবে সারাদিন এর জন্য ঘোরাঘুরি।
১২ টা লুচি, দুই সব্জি।৩০০ টাকা।
গাড়ি এলো আগের দিনের ড্রাইভারের ঠিক করা।সারাদিন ১৩০০ রুপি।খুবই আরামদায়ক গাড়ি।আর ৭/৮ জন বসা যায়।
গেলাম কালাপাথর বিচে।১৫ মিনেটের মতো লাগলো।
খুবই সুন্দর।আকাশী – নীল পানি।বড় বড় পাথর আছে তাই এই নাম।প্রচুর রোদ ছিল।তবে ছায়ায় বসার ব্যবস্থা আছে।ওদের বিচগুলোতে বসার চমৎকার ব্যবস্থা আছে।কাপড় চেঞ্জ এর রুম আছে, টয়লেট আছে।তাই নিশ্চিন্তে সময় কাটানো যায়।
সময় বেশি ছিল না কারন আমাদের এলিফেন্ট বিচে যেতে হবে।১১ টার পর আর কোন বোট যায় না।২/৩ টার মধ্যে ফিরে আসতে হয়।গেলাম জেটিতে।ওখানে টিকেট কাটা হলো ৯৫০ রুপি করে।৩ ঘন্টা পর ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।সাথে স্নোকেলিং কমপ্লিমেন্টারি।২০ মিনিট লাগে যেতে।রওনা হওয়ার আগে ডাব খেলাম (৫০ রুপি).কিন্তু যতজায়গায় ডাব খেয়েছি আন্দামানে এটা সবচেয়ে মিস্টি ছিল পানি।

প্রথমে ভেবেছিলাম এলিফ্যান্ট বিচ এ ৩ ঘন্টা কি করবো! গিয়ে দেখি উফ কি অদ্ভুত! কি অদ্ভূত! বালির বিচ দেখেছি, থাইল্যান্ড ও দেখেছি।ভারতে এত সুন্দর বিচ! তখনো জানি না সুন্দরের শেষ নেই।
যাই হোক এই বিচে ওয়াটার স্পোর্টস হয়।আমি জেট স্কি করলাম।ভয়ংকর মজা।মনে হচ্ছিল এখনি পড়ে যাব ঢেউ এর থাক্কায়।৬০০ রুপি।
কমপ্লিমেন্টারি স্নোকেলিং এ একটা পাইপ এর মতো দিয়ে করায়। আমরা এক্সট্রা ২০০ রুপি করে বেশি দিয়ে মাস্কটা নিলাম।এতে শ্বাস নেয়া যায়।জীবনে প্রথম স্নোকেলিং করলাম। থাইল্যান্ড এ ভয়ে করি নি। আমার ছেলেও করল কোন ভয় না পেয়েই।
অন্যগূলো করি নি।তাই দাম বলতে পারছি না।আমার কাছে মনে হয়েছে নীলদ্বীপে দাম একটু কম।ওখানে ডিসকাউন্ট ও দেয়।
যাই হোক স্বচ্ছ কাঁচের মতো পানি দেখে মাথাই নস্ট।পানিতেই কেটে গেল ২ ঘন্টা। ওখানে কাপড় চেঞ্জ করার ছেলে/ মেয়েদের আলাদা আলাদা ব্যবস্থা আছে।তবে এক রুমেই ২/৩ জন একসাথে চেঞ্জ করে এটাই সমস্যা।আমার মতে যেটা পড়ে স্পোর্টস করবেন সেটাই পড়ে যাবেন, পরে চেঞ্জ করে ছবি তুলবেন।
ফ্রুট চার্ট খেলাম।১০০ রুপি প্লেট!
ভেল পুড়ি চেয়েছি, ৫০ রুপি! পরে দেখি সেটা ঝাল মুড়ি!
মনে হচ্ছিল আরো থাকি।এত্ত এত্ত সুন্দর।বিশেষ করে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে জায়গাটার সৌন্দর্য এমন হয়েছে।কোনভাবেই এই বিচ মিস করা যাবে না।

দুপুর ১.৩০ এ ফিরিয়ে নিয়ে আসলো জেটিতে। আমাদের পরের দিনের নীল যাবার টিকেট পাচ্ছিলাম না।সরকারী ফেরির ৮০০ করে চাচ্ছিল।পাওয়া যাবে কিনা তাও নিশ্চিত করে বলছিল না।গ্রিন ওশেন এর টিকেট ১০০০-১১০০ করে বলছিল।এই অনিশ্চিত অবস্থাতেই আমরা যাই রাধানগর বিচের দিকে।ওখানে গিয়ে দুপুরের খাবার খাই।ফিস থালি, ভেজ থালি।১৮০/১৫০ মনে হয় নেয়।

পরে আমরা বিচে গিয়ে তো অস্থির।নীল সমুদ্র, বড় বড় ঢেউ।সবাই দাপাদাপি করছে পানিতে। থাইল্যান্ড এর karon বিচ এর সাথে এর মিল আছে।এখানেও লকার আছে, চেঞ্জ রুম আছে।চেঞ্জ রুম টা বনের অনেক ভিতরে। প্রথমে বুঝছিলাম না কি করব! পরে দেখি অনেকেই বিচেই সব রেখে সমুদ্রে নামছে।যা আছে কপালে অই পোশাকেই সব রেখে নেমে গেলাম।মোবাইল, প্রায় ১ লাখ রুপি থাকল বিচে।কিন্তু কেউ অন্যের কিছু ছুঁয়েই দেখেনা।

২ ঘন্টা ধরে চললো সমুদ্রের সাথে উথাল পাতাল খেলা।ছেলে কয়েকবার উল্টানি খেয়েও উঠেনা।কিছুক্ষন পর দেখি পায়ে টান পড়ছে। কি আর করা আমি উঠে পড়লাম।ওরা আরো কিছুক্ষন ছিল।
পরে দেখলাম এক অসাধারণ সূর্যাস্ত। রাধানগর সূর্যাস্ত এর জন্য বিখ্যাত।আসলেই খুব সুন্দর। সন্ধ্যার পর এখানে বিচে থাকা যায় না।আসলে আমি যা বুঝেছি শুধু গোবিন্দনগর আর বিজয়নগর বিচেই সন্ধ্যায় থাকা যায়।তাই ওদিকেই হোটেল নেয়া ভাল।আর ডিসেম্বর- এপ্রিল সিজন।এই সময়ে হোটেলের দাম তিনগুন অন্য সময়ের। ফিরে আসলাম হোটেলে।টিকেট এখনো হয়নি।টেনশন! বর রাগ প্রকাশ করছে না কিন্তু বুঝতে পারছি সেটা চেপে রাখছে।ওর মতে এত ঝামেলা না করে প্রাইভেট ফেরির টিকেট কেটে রাখলেই হতো!পরে এজেন্ট বললো পরেরদিন সকাল ৭.৩০ টায় জেটিতে যেতে সে প্রাইভেট ফেরিতে চেষ্ঠা করবে।বাজারে গিয়ে সি ফুড খেলাম ফিরে অনিশ্চয়তা নিয়ে রাতে হোটেলের পাশের বিচে একটু ঘুরে ঘুমিয়ে পড়লাম। হ্যাভ্লকে শেষ রাত।
বিদ্র: সুন্দর শুধু উপভোগ না যত্নও করতে হয়।তাই ঘুরতে গিয়ে বা কোথাও ময়লা ফেলবেন না।

source: Zeenat Sharmin‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment

Shares
error: Content is protected !! --vromonkari.com