সাগরকন্যা কুয়াকাটা

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাগর কন্যা কুয়াকটা যা পটুয়াখালী জেলায় অবস্থিত। কুয়াকাটা দক্ষিণ এশিয়ায় একটি মাত্র সমুদ্র সৈকত যেখানে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকন করা যায়। সমুদ্রের পেট চিরে সূর্য উদয় হওয়া এবং সমুদ্রের বক্ষে সূর্যকে হারিয়া যাওয়ার দৃশ্য অবলোকন করা নিঃসন্দেহে দারুন ব্যপার।

কুয়াকাটা বেরী বাঁধ পেরিয়ে সমুদ্র সৈকতের দিকে যেতেই বাম দিকে ব্যক্তিগত উদ্দ্যোগে মিউজিয়াম স্থাপন করা হয়েছে। এরপরই কয়েক গজ দক্ষিণে “ফার্মস এন্ড ফার্মস” এর রয়েছে বিশাল নারিকেল বাগানসহ ফল ও ফুলের বাগান। এ বাগানের মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট, এ পিকনিক স্পট পরিদর্শনের পরেই রয়েছে কাংখিত ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের বিশাল সমুদ্র সৈকত। এ সৈকতের পূর্ব দিকে এগুলোই প্রথমে দেখা যাবে নারিকেল বাগান, সুন্দর আকৃতির ঝাউ বাগান। বন বিভাগের উদ্দ্যোগে বিভিন্ন প্রজাতির ঝাউগাছ লাগিয়ে সমুদ্র সৈকতের শোভা বর্ধন করা হয়েছে। এ নারিকেল ও ঝাউবাগানের মধ্যেও রয়েছে পিকনিক স্পট যেখানে পর্যটকরা দল বেঁধে বনভোজনের অনাবিল আনন্দে নিজেদের একাকার করে তোলে। তার থেকে একটুই পূর্ব দিকে আগালেই চর-গঙ্গামতির লেক, সেখান থেকে একটু ভিতরে দিকে এগুলেই সৎসঙ্গের শ্রী শ্রী অনুকূল ঠাকুরের আশ্রম ও মিশ্রীপাড়া বিশাল বৌদ্ধ বিহার। সমুদ্র সৈকতের পশ্চিম দিকে লেম্বুপাড়ায় প্রতি বছর আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত জেলেরা প্রাকৃতির উপায়ে গড়ে তুলে শুটকী পল্লী। এ শুটকী পল্লীতে সাগরের বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রাকৃতিক উপায়ে শুটকীতে রূপান্তরিত করে সারা দেশে সরবরাহ করে।

কুয়াকাটায় সূর্যোদয় দেখার জন্য ঝাউবনে যাওয়াই ভালো। সেখান থেকেই সূর্যাস্ত ভালো দেখা যায়, সমুদ্রের পেট চিড়ে কিভাবে সূর্য উঠে তা দেখার জন্য আপনার মতো আরও অনেক লোকই আপনার আগে চলে যাবে সেখানে সন্দেহ নেই। সকাল বেলা হেটে হেটে ঝাউবনে যেতে সময় লাগবে ২০ মিনিট। আর ভ্যানে গেলে লাগবে ১০ মিনিট। সেখানে সারি সারি গাছ ভালো লাগবে। এই বনটি সরকার বনায়ন পরিকল্পনার অধীনে তৈরী করেছে। কারো কারো কাছে সূর্যোদয়ের চেয়ে সূর্যাস্তের দৃশ্যটা বোধহয় বেশি চমৎকার লাগে। সুর্যটা সমুদ্রে ডুবে যাওয়ার সময় রংয়ের পরিবর্তনটা আপনি স্পষ্টই দেখতে পাবেন।

সমুদ্রের গর্জন দিনের বেলা সাধারণত আশে পাশের শব্দের কারনে শোনা যায় না। সমুদ্রের যে একটা ভয়ংকর রূপ আছে তা বোঝা যায় রাতে। যদি রাতে সমুদ্রের গর্জন শুনতে চান তবে অবশ্যই যেতে পারেন সেখানে। নিরাপত্তা জনিত কোন ভয় নেই সেখানে। তবে সাবধানে থাকাই ভালো। সত্যি কথা বললে রাতের সমুদ্রের গর্জন সত্যিই ভয়ংকর। সৈকতের কাছাকাছি কোন হোটেলে থাকলে গর্জন হোটেল থেকেও শোনা যেতে পারে।

দর্শণার্থী ও ভ্রমণ পিপাসুদের জন্য এই সৈকতে আছে ভাড়ায় চালিত মটর সাইকেল ও ঘোড়া। ভাড়া সাধারণত দূরত্ব ও সময় অনুযায়ী হয়। কুয়াকাটার আশে পাশের বেশ কয়েকটি চর আছে। সেগুলি দেখতে আপনি যেতে পারেন স্পিডবোট ও ট্রলার কিংবা ইঞ্জিন চালিত বড় নৌকায় করে। কুয়াকাটায় সমুদ্র সৈকতের আশেপাশে বেশ কয়েকটি পিকনিক স্পট রয়েছে। সেগুলিতে রান্না করার সকল ব্যবস্থা আছে। চুলা, খড়ি, হাড়ি, পাতিল থেকে বাবুর্চি পর্যন্ত।

সমুদ্র উপকূলে পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য রয়েছে- সমুদ্র ভ্রমণকারী জাহাজ ও ট্রলার এবং স্পিড বোট। এসব জাহাজ ও ট্রলারে উঠে পর্যটকরা সুন্দরবনের অংশ বিশেষ ফাতরার চর, সোনার চর, কটকা, হাঁসার চর, গঙ্গামতির লেক ও সুন্দরবন সহ গভীর সমুদ্রে বিচরণ করে অফুরস্ত আত্মতৃপ্তিতে নিজেদের ভরে তোলে। সমুদ্র ভ্রমণকারী জাহাযে থাকা খাওয়ার সু-ব্যবস্থা রয়েছে।

কুয়াকাটায় সীমিত সংখ্যক দোকান আছে আপনি আপনার প্রয়োজনীয় ও সৌখিন জিনিসপত্র ক্রয় করতে পারবেন সেসব দোকান থেকে। দাম অপেক্ষাকৃত একটু বেশি হলেও অনেক নতুন নতুন আইটেম পাবেন। কুয়াকাটায় দেখার আরেক আকর্ষণ শুঁটকিপল্লি। কুয়াটায় শুটকি পল্লী থাকায় এখানে অনেক কম দামে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের শুটকি পাবেন। ইলিশ, রূপচাঁদা, হাঙর, লইট্যা, শাপলাপাতাসহ অসংখ্য প্রজাতির মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বিশাল এলাকায় চ্যাঙ বানিয়ে শুঁটকি তৈরির পদ্ধতি দেখা আরেক মজার অভিজ্ঞতা।

রাখাইন পল্লী:
কলাপাড়া উপজেলার পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা সৈকতের মনোরম দৃশ্য উপভোগের সাথে পর্যাটকদের জন্য রয়েছে বারতি আকর্ষন আদিবাসী রাখাইনদের স্থাপথ্য নিদর্শন। রাখাইন সম্প্রদায়ের প্রায় দুইশত বছরের পুরানো ঐতিহ্য রয়েছে। “গৌতম বুদ্ধের” বিশাল আকৃতির মূর্তি দেখতে পারেন। দেশের সবচেয়ে বড় বৌদ্ধ মন্দিরটির অবস্থান কুয়াকাটা থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে রাখাইন পল্লীতে। গৌতম বুদ্ধের এই ধ্যানমগ্ন মূর্তিটি ৩৬ ফুট উঁচু এবং এর ওজনসাড়ে ৩৭ মন। কুয়াকাটা থেকে সেখানে যাওয়ার জন্য মটর সাইকেল প্রধান বাহন। জানা গেছে, মন্দিরের নির্মান সৌন্দর্য চীনের স্থাপত্য অনুসরন করা হয়েছে।দেখে মনে হবে থাইল্যন্ড বা মিয়ানমার

কিভাবে যাবেন কুয়াকাটাঃ
ঢাকা থেকে সড়কপথে এর দূরত্ব ৩৮০ কিলোমিটার, বরিশাল থেকে ১০৮ কিলোমিটার। ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটি বাস এখন সরাসরি কুয়াকাটা যায়। ঢাকা থেকে সরাসরি দ্রুতি পরিবহন, সাকুরা পরিবহনসহ একাধিক পরিবহনের গাড়ীতে গাবতলী কিংবা সায়েদাবাদ বাসস্ট্যান্ড থেকে কুয়াকাটায় আসতে পারবেন। আপনি এসব বাসে গেলে আপনাকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ২০০ মিটার দূরে নামিয়ে দিবে। ভাড়া ৫০০-৫৫০। ঢাকা থেকে কুয়াকাটা বাসে যেতে মোট সময় লাগে প্রায় ১২/১৩ ঘন্টা। খুলনা থেকে কুয়াকাটার উদ্দেশ্যে সকাল ৭ টায় একটি বিআরটিসি বাস ছাড়ে। খুলনা থেকে যেতে সময় লাগে প্রায় ৭/৮ ঘন্টা।

আর উত্তরবঙ্গ থেকে আসতে চাইলে সৈয়দপুর থেকে খুলনা পর্যন্ত রূপসা অথবা সীমান্ত আন্তঃনগর ট্রেনে করে আসতে পারবেন। রাত্রের টেনে আসলে সকাল ৭ টার বিআরটিসি বাসে করে কুয়াকাটা যেতে পারবেন।

তবে বরিশালের পর সড়ক যোগে কুয়াকাটায় পৌঁছাতে আপনাকে লেবুখালী ফেরী পারাপার হতে হবে।

তবে যে সকল পর্যটকরা ঢাকা থেকে নৌ পথে কুয়াকাটায় আসতে চান, তারা ঢাকা সদরঘাট থেকে বিলাস বহুল ডাবল ডেকার এম.ভি পারাবত, এম.ভি সৈকত, এম.ভি সুন্দরবন, এম.ভি সম্পদ, এম.ভি প্রিন্স অব বরিশাল, এম.ভি পাতারহাট, এম.ভি উপকূল লঞ্চের কেবীনে উঠে সকালের মধ্যে পটুয়াখালী কিংবা কলাপাড়া নেমে রেন্ট-এ-কার যোগে এবং পটুয়াখালী-কুয়াকাটা রুটের বাসে চড়ে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটা পৌঁছাতে পারেন।

ঢাকা থেকে উল্লেখিত রুট সমূহের লঞ্চ গুলো বিকাল ৫ থেকে সন্ধ্যা ৭ টার মধ্যে লঞ্চ ঘাট ত্যাগ করে থাকে।

লঞ্চে সিঙ্গেল কেবিন ভাড়া ৯০০ টাকা।

Source: T A Sumaiya Akhi‎ <Travelers of Bangladesh (ToB) – ভ্রমন গাইড বাংলাদেশ

 

Share:

Leave a Comment

Shares
error: Content is protected !! --vromonkari.com