সেরা রোমাঞ্চকর একটি গল্প নুব্রাভ্যালী থেকে তুরতুক

যখন থেকে এই মানালি-লেহ হাইওয়ে ধরে খারদুংলা হয়ে শ্রীনগর থেকে জম্মু হয়ে ফেরার পরিকল্পনা করেছিলাম কখনো কোন ভাবনাতেই তুরতুক ছিলোনা মাথায়। থাকবে কি করে তুরতুক তো তখনো অচেনা অজানা আমাদের কাছে। তুরতুক নিয়ে প্রথম কিছুটা জানতে পারি এক আপুর লাদাখ প্ল্যানের পর থেকে। আর এরপর তুরতুক ঘুরে আসার গল্প শুনি আর ছবি দেখি মাহাদি সুমনের তুরতুক ঘুরে আসার পর থেকে। তাই এই পার্পেল ড্রিম ট্রিপের একদম শেষ দিকে তুরতুকের সংযোজন।

তো তুরতুক হল বিধাতার এক অসীম আশীর্বাদ! সেই গল্প পরে বলবো আলাদা করে। এখন শুধু বলবো নুব্রা থেকে তুরতুক যাবার ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতার গল্প। খারদুংলা থেকে শুরু করে কখনো লাল পাহাড়, কখনো হলুদ পাহাড়, কখনো তামাটে, কখনো কালো পাহাড় আর সিন্ধু, সায়ক নদীর নানা রকম চড়াই উৎরাই পেরিয়ে যখন নুব্রা ভ্যালীর শুরু হয় তখন দুপুর প্রায় ১২ টা।
পাহাড়ি খাড়া পথ পেরিয়ে হুট করেই আমরা নেমে এলাম একদম সমতলে মধ্যে। চারদিকে নানা রঙের, রকমের আর ধরনের পাহাড় ঘিরে ধরেছে পুরো নুব্রা ভ্যালীকে। নুব্রা পৌঁছানোর পর থেকে ড্রাইভার নানা ভাবে আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করলো যে তুরতুক অনেক ঝামেলার, কষ্টের, ঝুঁকিপূর্ণ তাই ওদিকে না গিয়ে নুব্রাতেই সারাদিন কাটাই। কিন্তু আমরা আমাদের তুরতুক যাবার পরিকল্পনায় অটল থাকায় নতুন করে পাসপোর্ট দেখিয়ে পারমিশন নিয়ে, থানায় এন্ট্রি করিয়ে নিয়ে অনুমোদন নিতে হবে থানা থেকে। ঠিক আছে তাই হোক তবে, চল নুব্রা থানায় ড্রাইভারকে বললাম। দারুণ একটি নির্জন রাস্তা দুপাশে কাটা দিয়ে ঘেরা বেশ গাঁ ছমছমে একটা পরিবেশের মধ্যে দিয়ে আমাদের নিয়ে যাওয়া হল নুব্রাভ্যালী পুলিশ স্টেশনে!

সায়ক নদীর তীর ঘেঁসে জেগে ওঠা কিছু সবুজ অরণ্য আর ফুলের মাঝে পুরনো কোন একটা পরিত্যাক্ত বাড়ির মনোরম গেট আর আরামের আঙিনা পেরিয়ে প্রথমবার ঢুকলাম ভারতীয় কোন পুলিশ থানায়। প্রথমে একটু হকচকিয়ে গেলেও সেটা সামলে নিয়েছিলাম। সবাই গাড়িতেই ছিল আমি একাই গিয়ে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিয়ে অনুমোদন পেলাম। বারবার করে যেনে নিল আমাদের কাছে কোন ভিডিও ক্যামেরা কোন ড্রোন বা এমন অতি আধুনিক কোন যন্ত্র আছে কিনা? পরে ধরা পরলে মহা মুশকিল হবে জানিয়ে দিল! আমিও নেই বলে নিশ্চিত করে বেরিয়ে আসবো। তখন নতুন প্রশ্ন তুরতুক রাতে থাকবো কিনা?

না বলাতে বলা হল, তাহলে নুব্রাভ্যালীতে থাকার যায়গা ঠিক করে, সেই ঠিকানা আর সবার পাসপোর্ট এর কপি জমা দিয়ে যেতে বলা হল। ড্রাইভার সেই ভাবেই সব কাজ শেষ করে শুরু করলো নুব্রা থেকে তুরতুকের পথে চলা। যে রাস্তাটা পুরো নামালি-লেহ হাইওয়ের চেয়েও বহুগুণ দুর্ধর্ষতাপূর্ণ, রোমাঞ্চকর আর অনেক বেশী ঝুঁকিপূর্ণ মনে হয়েছে। তাই উপভোগটাও করেছি সবটুকু তাড়িয়ে তাড়িয়ে।
মানালি-লেহ হাইওয়ে তে আপনি যখন যাবেন বা আসবেন তখন একটু পর পরই আপনি কোন না কোন মানুষের দেখা পাবেন। হয় গাড়িতে, নয় জীপে অথবা বাইকে বা ট্রাকে। আর বেশ কিছু সময় পরপর তো ধাবা বা থাকার যায়গা থাকেই। আছে প্রায় মসৃণ পথ পাহাড়ের বাঁক আর উচ্চতা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও গাড়ি বেশ জোরেই চলতে পারে প্রায় পুরো পথের অধিকাংশই। কিন্তু এই পথ? এই নুব্রাভ্যালী থেকে তুরতুকের যাবার ৮০ কিলোমিটার রাস্তা যেন আলাদা একটা জগৎ, নীরব, নির্জন আর হাহাকার তোলা কোন পথ।

নুব্রা ভ্যালীর সমতলের পথটুকু ছাড়িয়ে পাহাড়ের বাঁকে উঠতেই একরাশ নির্জনতা আর আচমকা নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরবে আপনাকে। আর সবচেয়ে গাঁ ছমছমে অনুভুতি দেবে আপনাকে হাজার ফুট নিচ দিয়ে ভয়াবহ বেগে বয়ে যাওয়া সায়ক নদী। যার পানির স্রোত এতোটাই বেশী এতোটাই বেশী যে বিশাল বিশাল পাথর পর্যন্ত এক জায়গা থেকে আর এক যায়গায় স্থানান্তরিত হচ্ছে নিয়মিতই! অধিকাংশ রাস্তাই রুক্ষ আর ঝুরো পাথরে ভরপুর, যেখানে সেখানে পাহাড় থেকে ঝরে বা গড়িয়ে পরে ছোট-বড় নানা আকৃতির পাথর নিয়মিত! রাস্তা এতোটাই সরু যে একটি গাড়িকে সাইড দিতে হলে অনেক আগে থেকেই সাইড দিয়ে দাড়িয়ে থাকতে হয়, এই ভয় নিয়ে যে দমকা কোন বাতাসে গাড়ি আবার উড়ে না যায় সায়কের স্রোতের মাঝে!

মাইলের পর মাইল চড়াই আর উৎরাই। মাঝে দুই একটি যায়গায় সেনাবাহিনী ও বিমান বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত এলাকা যেখানে আবার স্পষ্ট করে লেখা আছে ছবি তোলার চেষ্টা করা হলে বা দেখতে পেলে কোন প্রশ্ন ছাড়াই গুলি করবে! এতটাই সংরক্ষিত সেইসব এলাকা। আর বেশ কয়েকবার এক পাহাড় থেকে আর পাহাড়ে গায়ে ওঠানামা করার সময় সায়ক নদী পার হবার যে এক একটা লোহার ঝুলন্ত সাস্পেন্সন ব্রিজ প্রতিটিই অনন্য দক্ষতায় গড়ে তোলা হয়েছে।

যার প্রতি মুহূর্তের নিরাপত্তা ও রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য রয়েছে আলাদা আর্মির টিম সার্বক্ষণিক। রয়েছে অসংখ্য সিকিউরিটি পয়েন্ট যার প্রায় চারটাতে দেখাতে হয়েছে অনুমোদন আর পাসপোর্ট একটি একটি করে। এতোটাই রোমাঞ্চকর আর দুর্দান্ত ছিল সেই রাস্তার পুরোটুকুই।

প্রত্যেকটা পাহাড়, প্রতিটা বাঁক, প্রতিটা চেকপোস্ট আর প্রতিটা ব্রিজ যেন একটা একটা আলাদা আলাদা রোমাঞ্চের পসরা সাজিয়ে বসে আছে! আর পুরোটা পথ জুড়ে গতিশীল, কাঁদা পানির সায়কের বয়ে চলা তো ছিলই অবিরাম। এভাবে ৮০ কিলোমিটার ভয়াবহ বাঁকের, সরু, ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা প্রায় ৩ ঘণ্টা পারি দিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম “বিধাতার বিশেষ আশীর্বাদ তুরতুক গ্রামে!”
নুব্রাভ্যালী থেকে তুরতুকের যে রাস্তাটা আর সেই রাস্তার তিনঘণ্টা রোমাঞ্চকর জার্নিটা আমার কাছে মনে হয়েছে মানালি-লেহ হাইওয়ের চেয়েও বহুগুর রোমাঞ্চকর, উত্তেজনায় ঠাসা, আর উপভোগের পসরা সাজানো। আমার কাছে এখন পর্যন্ত সেরা রোমাঞ্চকর রাইড এই নুব্রাভ্যালী থেকে তুরতুক যাবার ৮০ কিলোমিটার রাস্তাটা।
পরিবেশ আমাদের অমুল্য সম্পদ, তাকে আমরা নোংরা করে ধংস না করি।
source: Sajol Zahid‎ <Travelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment

Shares