স্প্রীভাল্ড ,লুবেনাও

স্প্রীভাল্ড , স্প্রী নদীর শাখা প্রশাখার মাঝে বিস্তৃত বনাঞ্চল। যেখানে যাওয়ার পর আমার প্রথম মনে হয়েছে আমি বাংলাদেশের কোন গ্রামে চলে এসেছি। তাও এখনকার কোন গ্রামে নয়, বরং ছোটবেলার গ্রামে, যেখানে নেই কোন যান্ত্রিক শব্দের ছোঁয়া। পাখির কলকাকলিতে মুখর চারিদিক। শুধুমাত্র নৌকা দিয়ে এক পাড়া থেকে অন্য পাড়া, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যাওয়া যায়। কী যে সুন্দর, ভাষায় প্রকাশ করার মত না, শুধুমাত্র অনুভব করা যায়। একদম স্বপ্নের মত। এরকম অভিজ্ঞতা আমাকে আগে কখনও হয়নি, নৌকায় করে বনের একটু গভীরে যাওয়ার পরই মনে হল আমি যেন অন্য কোন দুনিয়ায় চলে এসেছি, কেমন যেন ঘোরের মধ্যে ছিলাম। সেই অনুভূতি প্রকাশ করার একমাত্র বাহন হল জার্মান শব্দ “ Waldeinsamkeit” যার অর্থ একা একা বনের ভিতরে গিয়ে প্রকৃতির সাথে বিলীন হয়ে যাওয়ার অনুভূতি। আমি গিয়েছিলাম অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে। শরৎকাল শুরু হয়ে যাওয়ায় মানুষ খুব কম ছিল। আগেই বলেছিলাম আমি নিরিবিলি প্রকৃতি উপভোগ করতে পছন্দ করি, তাই আমার মত যারা নিরিবিলি প্রকৃতি উপভোগ করতে পছন্দ করেন তাদের জন্য শরৎকাল হচ্ছে সবচেয়ে সঠিক সময়।

স্প্রীভাল্ডকে বলা হয় সবুজ ভেনিস, পৃথিবীর অদ্বিতীয় এক প্রাকৃতিক অঞ্চল। ৯৭০ কিলমিটার জুড়ে বিস্তৃত ২০০টিরও বেশি আঁকাবাঁকা ছোট ছোট খালগুলো তৈরি করেছে গ্রামের পর গ্রাম। বরফযুগে তৈরি এই অঞ্চল এখন UNESCO World Heritage Site যা সংরক্ষিত জীববৈচিত্র্য অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। জার্মানির রাজধানী বার্লিনের আশেপাশের অনেকগুলো শহর থেকে স্প্রীভাল্ডের প্রবেশপথ থাকলেও আমি গিয়েছিলাম লুবেনাউ(Lübbenau) এর পথ ধরে। বার্লিন থেকে আন্তঃনগর ট্রেন(RE) RE2 তে এক ঘণ্টায় চলে যাওয়া যায় লুবেনাউ, আর স্টেশন থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা দূরত্বেই রয়েছে Grosshafen, স্প্রীভাল্ডের প্রবেশপথ। সেখান থেকে কায়াক ভাড়া করে স্প্রীভাল্ডের ভিতর ঘুরে আসা যায়। অথবা স্প্রীভাল্ডের ঐতিহ্যবাহী নৌকায় করে এক বা দুই গ্রাম ঘুরে আসা যায়। নৌকার ভাড়া কোম্পানিভেদে এবং ঋতুভেদে ১২ থেকে ২০ ইউরোর মতো পড়ে। এক ঘণ্টার নৌকা ভ্রমন শেষে যখন আমরা তীরে এসে পৌঁছলাম মনে হল যেন স্বপ্ন থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম। কিন্তু সেই ভাললাগা, সেই অনুভূতি আমাকে মোহিত করে রেখেছিল আর কয়েকদিন।

স্প্রীভাল্ডের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রয়েছে মাছ ধরার বক্স। বক্সের মধ্যে খাবার দিয়ে সেগুলো খালের পানিতে নামিয়ে দেয়া হয়। বিভিন্ন রকমের মাছ খাবারের লোভে সেই ফাঁদে ধরা পড়ে। রয়েছে নিজস্ব ডাক ব্যবস্থা এবং আবর্জনা সংগ্রহ করার পদ্ধতি। এখানকার মূল অধিবাসীরা জার্মান নয়, বরং স্লাভিক উপজাতি। যদিও বর্তমানে অনেক অবসরপ্রাপ্ত জার্মান এখানে এসে থাকা শুরু করেছে, কিন্তু মূল ঐতিহ্যর কথা মাথায় রেখে তাদের অনেক নিয়ম কানুন মেনে চলতে হয়। সংরক্ষিত জীববৈচিত্র্য অঞ্চল বলে পর্যটকদের হাতেও নিয়ম কানুনের বিশাল তালিকা ধরিয়ে দেয়া হয় এবং তারা সেটা পালন করছে কিনা তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

স্প্রীভাল্ড বিখ্যাত হবার অন্যতম আরেক কারণ হলো এখানকার জৈব ফসল, তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এখানকার শসা। কত রকমের শসা যে পাওয়া যায় এখানে! ভিনেগার, অনেক রকমের লতাপাতা আর মসলার মিশ্রনে শসা ভিজিয়ে রাখা হয়। জার্মানদের কাছে এমনভাবে তৈরি শসা আর অন্যান্য সবজি অনেক প্রিয়। তাই স্প্রীভাল্ডে এসে ঐতিহ্যবাহী কিছু খেতে চাইলে এখানকার শসা খেয়ে দেখতে পারেন। আমার কাছে সবচেয়ে ভাল লেগেছিল ভিনেগার-মরিচ এবং ভিনেগার-মধুর মিশ্রিত শসা।

দেশে বিদেশে আমরাই দেশের প্রতিনিধিত্ব করি, তাই যেখানেই যাই, দেশে বা বিদেশে, আসুন আমাদের অপ্রয়োজনীয় জিনিসগুলো যথাস্থানে ফেলি।

Share:

Leave a Comment

Shares
error: Content is protected !! --vromonkari.com