অপরূপ সৌন্দর্যের টানে ত্রিপুরা ভ্রমণ

আগের দিন আসামের শিলচরের ট্রেনে চড়ে ত্রিপুরা এসেছিলাম, দারুণ মুগ্ধ একটা পথে। পাহাড়, অরণ্য, ঝিরি, টানেলের অন্ধকার, অরণ্য আচ্ছাদিত বর্ণীল স্টেশন এসব দেখে দেখে মনপ্রান ভরে গিয়েছিল। পরদিন খুব ভোঁরে ঘুম থেকে উঠেই আগরতলা বর্ডারে চলে এলাম। লক্ষ্য যত দ্রুত ট্রেন বা বাসে করে ঢাকায় পৌঁছে অফিস ধরা। আগরতলা বর্ডারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ৫ কিলোমিটার অপূর্ব পথে আখাউড়া স্টেশনে দিকে যখন যাচ্ছিলাম, তখন আগের দিনের চেয়েও মনটা বেশী ভালো আর ফুরফুরে লাগছিল অটো রিক্সায় করে ফিরে আসার সময় দুই পাশের পাগল করা সবুজের ঢেউ দেখে।

কি যে অদ্ভুত আমাদের গ্রাম্য প্রকৃতি যেটা শুধু দেখে নয় অনুভব করতে পারলেই একমাত্র উপলব্ধি করা সম্ভব। মিহি পিচ ঢালা চকচকে পথে ছুটে চলেছি আগরতলা থেকে আখাউড়ার দিকে। পথের দুইপাশে ছোট আর মাঝারি গাছের সারি, পথের শেষেই নীল আকাশ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ঘন সবুজ ধান ক্ষেতের মায়াবী আহবান, কাছে দূরে দুই একটি ঘরবাড়ি, ঝিরঝিরে বাতাসে ইচ্ছে হয় উড়ে যাই বাতাসের সাথে দূরে কোথাও। একবার তো অটোকে থামিয়ে কয়েক মিনিটের জন্য নেমেই গেলাম। সবুজ ঘাসে খালি পায়ে ছুঁয়ে দেখতে, মাটির গন্ধ পেতে, ধান গাছের মাদকতা স্পর্শ করে, সুখ অনুভব করতে।

কি যে অদ্ভুত ছিল সেই সময়টুকু। সবুজ গাছের মাঝে বসে ছিলাম, মাঝারি একটা গাছের ছায়ার নিচে, চারপাশে শুধু সবুজের ঢেউ, ধান ক্ষেত, অজানা গ্রামের ছোট ছোট ঘরবাড়ি, ঝিরঝিরে বাতাস, শরতের ঝরঝরে নীল আকাশ, দুই-এক খণ্ড সাদা মেঘের থমকে যাওয়া। এসব ছেড়ে একদম উঠে আসতে ইচ্ছে করছিলনা। কিন্তু ট্রেন ধরতে হবে বলেই উঠে আবারও অটো রিক্সায় চেপে বসতে হল। ১৫ মিনিটের মধ্যে আখাউড়া স্টেশনে চলে এলাম। তখন সকাল সাড়ে আটটা বাজে। একটা ট্রেন আছে ৯:১৫ তে আসবে। ঢাকার দিকেই যাবে। ব্যাস হাতে কিছু সময় আছে বলে নাস্তা করে নিলাম স্টেশনের সাথের এক হোটেলে।

এরপর স্টেশনে এলাম। রেলস্টেশন বরাবর আমার খুব খুব প্রিয় একটা যায়গা, সেটা যেমনই হোক। ভাবলাম এই স্টেশনে তো এর আগে কোনদিন আসিনি তাই একটু ঘুরে ঘুরে দেখা যাক। তো স্টেশন ঘুরে দেখতে শুরু করে আর টিকেট কাটতে গিয়েই শুরু হল নতুন নতুন অভিজ্ঞতার সামনা সামনি হওয়া, যেটার জন্যই এই লেখার অবতারণা।

সেটা হল, টিকেট যেখান থেকে দেয় সেখানে কোন টিকেট ছিলোনা নির্ধারিত আসন পাওয়ার মত। কিন্তু স্টেশনে পানের দোকান, কনফেকশনারী, মুচি, চা বিক্রেতাসহ নানা রকম মানুষের কাছে সব শ্রেণীর টিকেট আছে। ডাবল দামে নিতে হবে! শুধু ওই স্টেশনের টিকেটই নয়, আগে আর পরের অন্যান্য স্টেশনের টিকেটও আছে ওনাদের কাছেই!

চমৎকার ব্যবস্থা, আর এটা স্টেশন মাস্টার থেকে শুরু করে যারা টিকেট দেয় তারাও এটার সাথে জড়িত! কারন ওরাও রেফারেন্স দিয়ে বিভিন্ন দোকানে পাঠাচ্ছে পরিচিত যাত্রী এলেই। শুধু অবাক হলাম না, স্তব্ধ হয়ে গেলাম ব্যবস্থাপনা দেখে! আর স্টেশনে পরিচ্ছন্নতা নিয়ে আর কি বলবো? যতটা বলবো, ততটাই কম বলা হবে। পুরো স্টেশন জুড়ে যেন নোংরা আবর্জনার ছড়াছড়ি। যার যেখানে যা খুশি তাই ফেলে দিচ্ছে নিজের ব্যবহারের পরের উচ্ছিষ্ট। অথচ পুরো স্টেশন ঘুরে ঘুরে আমি অশিক্ষিত লোকজন খুব কমই চোখে পরেছে। সকালের স্নিগ্ধতা জড়ানো মনটা নিমিষেই খারাপ হয়ে গেল বেশ।

যাই হোক, ১৫ মিনিট দেরি করে ট্রেন এলো। আরও ১০ মিনিট অপেক্ষা করার পরে ট্রেন ছাড়ল। ভিড় ঠেলে নিজের আসনে গিয়ে মনটা খারাপটা কিছুটা দূর হয়ে গেল। কারন ছোট্ট ট্রেনের জানালার কাছে একটা সিট পেয়েছি বলে। কারন সেই কৈশোর থেকেই ট্রেন আর জানালার পাশের সিট খুব প্রিয় একটা যায়গা। দারুণ কিছু মুহূর্ত পাওয়া যায় এমন যায়গায় বসে ট্রেন ভ্রমণ করতে পারলে। দুই পাশের নির্মল সবুজ গাছপালা, ধান ক্ষেতের বিস্তীর্ণ প্রান্তর, ছোট বড় জলাশয়, নদী, ব্রিজ, নানা রকম স্টেশন, নানা ধরনের যাত্রী, হকার, বিভিন্ন মানুষের অভিব্যাক্তি, কেউ নামে কেউ ওঠে এসবের নানা রকম মুহূর্তের সাথে পরিচিত হওয়া যায়।

ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পর থেকেই মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিলাম একদম গ্রামীণ সবুজের নিখাদ প্রকৃতির দিকে। চোখ জুড়ানো সবুজ যাকে বলে, প্রান ভরে যাওয়া প্রকৃতি ছিল ট্রেন চলার পুরোটা পথেই। সরু রেললাইন, মাঝারি স্টেশন আর নানা রকম মানুষের অদ্ভুত অদ্ভুত অভিব্যাক্তি। সবকিছু ভালো লাগছিল, কানে হেডফোনে ফুল ভলিউমে প্রিয় গান বাজিয়ে দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু একটু পর পরই মন খারাপ হয়ে যেতে থাকলো। যখনই কোন স্টেশনে ট্রেন থামতে লাগলো। নাহ, ট্রেন থেমে থাকার জন্য নয়। স্টেশন আর ট্রেনের ভিতরে থাকা যাত্রীদের আচার আচারন দেখে।

যে যা খাচ্ছে, সেটার বাকি অংশ ট্রেনের মেঝেতেই ফেলছে, সিটের নিচে পর্যন্ত সরিয়ে রাখেনা কেউ। আর স্টেশন গুলো যেন আগেই মলেছি ময়লার ভাগাড় মনে করে সেখানে যার যা ফেলার, ছুড়ে ফেলে দিচ্ছে। কলার খোসা, চিপসের প্যাকেট, সিগারেট, পানের পিক, চকলেটের খোসাসহ যার যার ফেলে দেয়া দরকার তার সব সব সবকিছুই।

শেষ পর্যন্ত এক জনকে দেখানোর জন্য একটা চকলেট বের করে মুখে দিয়ে তাকে দেখিয়েই চকলেটের প্যাকেটটা নিজের পকেটে রেখে দিলাম, যদি একটু লজ্জা পায় বা দেখেই শেখে সেই আশায়! কিন্তু আমার সে আশায় জল ঢেলে দিয়েই মনে হয় আরাম পেল। একটু পরেই কলা ছিলে খোসাটা থেমে থাকা স্টেশনের উপরেই ছুঁড়ে ফেলে দিল!

এটা দেখে ইচ্ছে হচ্ছিল ওকে নয়, নিজেকেই একটা কষে চড় লাগাই! সেটা যেহেতু পারিনি তাই, মনে মনে নিজেই নিজেকে বললাম, ব্যাটা তোকে কে বলেছে সচেতন করতে গিয়ে লোক দেখিয়ে পকেটে চকলেটের খোসা ভরতে?

এরপর আর কোন স্টেশনে তাকাইনি। যখনই স্টেশনের কাছে এসেছে আমি চোখ বন্ধ করে গানে মনোযোগ দিয়েছি। আর ট্রেন ছেড়ে দেয়ার পরে চোখ খুলে অপলক তাকিয়ে থেকেছি, ছুটে চলা সবুজ গাছ-গাছালি, ঢেউ খেলে যাওয়া ধান ক্ষেত, নানা রকম মন ভালো করে দেয়া জলাশয়, পুকুর, নদী, বিল, ঝিল, সাদা, গোলাপি আর লাল শাপলা, কখনো কখনো শুভ্র কাশ ফুলের দিকে তাকিয়ে থেকে।

Source: Sajol Zahid‎<Travelers of Bangladesh (ToB)

 

Share:

Leave a Comment

Shares