ইটনা, কিশোরগঞ্জ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিন

সবাই নির্ঘুম রাত কাটিয়ে সকাল ৫টায় রওনা হলাম মহাখালী বাস স্ট্যান্ড এর উদ্দেশ্যে উবার এর কল্যাণে মাত্র ১৬০টাকা দিয়ে বনশ্রী ব্লক বি থেকে গন্তব্যে পৌঁছালাম। মহাখালী থেকে বাস স্ট্যান্ডের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে হাতের বামে একটু ভিতরে গিয়েই পেয়ে যাবেন কিশোরগঞ্জের বাস, নাম অনন্যা।২২০টাকা করে টিকেট করে নিলাম নাম অনন্যা হলেও দেখতে মোটেও অনন্যার কোন কিছুই ছিল না। বাসের ভিতরে যদিও নিরাপদ সড়ক যাত্রার প্রতিশ্রুতির স্টিকার দেখেছিলাম। কিন্তু সেই কি যে চালাইল ওয়াও, জাস্ট থ্রিলিং সত্যিকারের।যদিও এর আগের রাতে না ঘুমানোর কারণে বাস যাত্রার বেশিরভাগ সময়ই আমি ঘুম ছিলাম। কিন্তু যতবারই ঘুম ভেঙেছে নিজেকে সিট হতে বরাবর উপরে ভাসমান অবস্থায় আবিস্কার করেছিলাম।

অবশেষে ৩.৩০ ঘন্টা পর প্রায় ১০ঃ৩০A.M এসে পৌঁছালাম। হাল্কা নাস্তা করেছিলাম ওখানে দাম নাগালের মধ্যেই। বাস মোটেও আস্তে চালাই নি, রাস্তাটি খুবই সরু এবং খারাপ। সেখান থেকে টমটম করে জন প্রতি ১৫টাকায় স্টেশন রোড়। ২০টাকা করে চেয়েছিল, একটু কথা বলে নিলেই ১৫টাকায় যাওয়া যায়। স্টেশন রোড দিয়ে সামনে এগুতে এগুতে বুঝতে পারলাম আমি কোন অজপাড়া গাঁয়ে না। সব ই আছে এখানে, সব অনেক গোছালো। রাস্তার অবস্থা দেখে যেরকম ভেবে রেখেছিলেন সব চিন্তা ভাবনাকে চপেটাঘাত দিয়ে আমার ধারণা ভুল প্রামাণিত হল। আমি খুবই আনন্দিত অনুভব করলাম।যাই হোক এবার গাড়ি চলতে চলতে এসে গেল স্টেশন রোড, একদম সোজা রাস্তা। এরপর স্টেশন রোডে অনেক সি.এন.জি পেয়ে গেলাম কিন্তু আমাদের একটা দরকার 🤣, জন প্রতি ৪০টাকার বিনিময়ে রাজি হল চামড়া বন্দর আসার জন্য। সি.এন.জি একটু চলতেই শুরু হল সবুজের সমারোহ, সম্ভবত তাই জন্যই শহরের জঞ্জাল ঠেলে এখানে এসেছি, আর ভাবছি এই বুঝি ইটনার সৌন্দর্য।

সবুজ পাটক্ষেত আর গাছপালা তার মধ্যে কয়েকটি বাড়ি দেখে মন জুড়িয়ে যাবেই। ছোট খাট বাজার ফেলে এসে পরলাম চমড়া বন্দর। সত্যি বলেতে একটুও চামড়ার গন্ধ পাই নি। যাই হোক নৌকায় উঠার জন্য কয়েকটি ঘাট আছে। সোজাসুজি রাস্তার সাথে মুখোমুখি ঘাট টাকে এক নাম্বার ধরে নিলে হাতের বামের ২নং ঘাটে লোকাল ইঞ্জিন চালিত নৌকা। এর পরের টা তে রিজার্ভ স্পীড বোট পাওয়া যায়, কৌতূহল বশে জিজ্ঞাসা করেছিলাম তারা দাম হাকিয়েছিল ১২০০-৩০০০টাকা,৭০০-১০০০টাকায় ম্যানেজ করা যেতে পরে আনুমানিক সময় ৩০-৪৫মিনিট। আমরা ভাই স্টুডেন্ট মানুষ তাই লোকাল এই উঠলাম।৬০টাকা করে, অবশ্যই ভিতরে ঘরের মত করে দেওয়া আছে ভিতরে বসতে হবে। কারণ তারা ছাদে মালামাল নিবে। সম্ভাবত প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির বেশিরভাগই এভাবে যোগান দেওয়া হয়। পরে আপনি ইচ্ছা করলে ছাদে উঠে বসতে পারেন।

জানতে পারলাম প্রত্যেক এক ঘন্টা পর পর বোট ছেড়ে যায় ইটনা র উদ্দেশ্যে। ছবি তুলে আর শুয়ে শুয়ে পার করে এলাম। একদম শেষ পর্যন্ত যেতে হবে ইটনা বাজার, এটাই বোটের শেষ গন্তব্য।২ঃ৩৪ এ এসে পৌঁছে গেলাম। হাওরে মানুষকে গোসল করতে দেখে আমাদের মনেও গোসলের ইচ্ছা জেগে উঠল। এসেই জেটি থেকে ডানে গেলেই গেস্ট হাউস, আমরা ঠাকুর গেস্ট হাউস এ তাদের সিস্টেম পার হেড ১৫০টাকা/নাইট। অনেক বুঝিয়ে বাজিয়ে আমরা একটা ডাবল বেড, আর একটা সিংেল বেড নিলাম ৬০০টাকায়। ২৪ঘন্টার জন্য। ব্যেস এবার একটু আসা যাক, যত তারাতাড়ি সম্ভাব গেলাম হাওরে গোসল করতে। নেমে পরলাম চোখ বন্ধ করে। চোখ বন্ধ কারার কারণ হল, দেখলাম এক লোক পানিতেই মূত্র বিসর্জন দিচ্ছে। উফ কি যে ময়লা কি নেই পানিতে। তবুও লোভ সামলাতে না পেরে সাঁতার কাটছিলাম। তা আর বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না, যা না দেখার তাই দেখে গেলাম, মানুষের মল। এবার লোভ আর রইল না। দৌঁড়ে পালিয়ে এলাম পানি থেকে কিছুক্ষণের মধ্যেই। তখন মনে পরল আমাদের গর্ব সাকিব আল হাসানের লাইফবয় সাবানের বিজ্ঞাপনের কথা। তাই ৩০টাকায় একটা লাইফবয় সাবান নিয়ে ওয়াশরুমে নিজেকে ভালোভাবে ধৌত করে নিলাম। কাপড়ও বাদ যায়নি।

যাই হোক ভাত খেয়ে দেয়ে এবার একটু ঘুরে আসা যাক। এক্সট্রা ভাত ২০, মুরগী ৬০, হাঁস ৮০, ছোট মাছ ৪০, শিং মাছ ৮০, পানির দাম ৫/১০টাকা বেশি থাকে(রিয়া হোটেল) গেস্ট হাউসের বাম পাশে যদি হাওরের দিকে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।যাই হোক খাওয়া দাওয়া শেষ করে এবার একটা টমটম ঠিক করলাম, একটা দোকানদার এ বিষয়ে আমাদের সাহায্য করেছিল, গন্তব্য ঠিক করা হল, তাদের স্বপ্নের সড়ক দেখার। যেটা নাকি ঢাকা সাথে তাদের যোগাযোগ এর পথ হবে কখনও। সত্যি মারাত্নক নয়নাবিরাম দৃশ্য, আপনার মন ভরে উঠবেই গ্যারেন্টি দিলাম। রাস্তায় যখন দাঁড়িয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করবেন, হাওরের বাতাস আপনার মনের ঘন্টা টা কে টং টং করে বাজাবেই। ছোট্ট স্কুল ঘর পাশেই খেলার মাঠ একদম কবিতার মত লাগছিল। ছোট্ট বাচ্চাগুলো নৌকায় তাদের কারসাজি করে বেড়াচ্ছে। আমাদের কে নিতে বলেছিলাম নেই নি😭।এরপর ছোটখাটো একটা জমিদার বাড়ী, জমিদারের নাম ভুলে গিয়েছি। পুরাতন একটা মসজিদ দেখে আমাদের ঘুরাঘুরি সম্পূর্ণ।

এতক্ষণ ঘুরে ৩০০টাকাতেই রাজি হয়ে গেল টমটম ড্রাইভার। উনিও অনেক ভালো, আমাদের জমিদার বাড়ির ভিতরে যেতে সাহায্য করেছিলেন। সন্ধ্যায় হাল্কা নাস্তা করে। হাওরের পাশে বসে আকাশ দেখা টা অনেক মজার। আকাশ টা নতুনভাবে আবিস্কার করেছিলাম। যত দেখছি ততই ভালো লাগছে। তার মধ্যে আকাশের গুড় গুড়ানি আর ঝলকানি। এককথায় অসাধারণ অভিজ্ঞতা। রাতে খাওয়া দাওয়া করে সকাল ১১টায় আবার ও ঢাকার উদ্দেশ্যে বের হয়ে গেলাম। আসার সময় বোটের ছাদে বসার চেষ্টা করবেন মন্দ লাগবেনা। যদি ছাতা নিয়ে যান তাহলে সূর্যের ভালোবাসা থেকে বাঁচতে পারবেন। আসার সময় যাতায়াতের বাসে করে এসেছিলাম সিট ভালো দেখালেও, বসতে মোটেও আরামদায়ক নই। আমরা ৫জন গিয়েছিলাম, জন প্রতি খরচ হয়েছিল ১২০০টাকা(ঢাকা টু ইটনা)।

বি.দ্র. ইটনার মানুষ খুবই অতিথিপরায়ণ। তাদের ব্যবহারে আপনি মুগ্ধ হবেন। আর জিনিস পত্রের দাম,ভাড়া কিচ্ছুই তেমন বেশি চাই না। আর পরিবেশটা আমাদেরই,যেখানেই যায় না কেন পরিবেশ সুন্দর রাখার চেষ্টা করি, ময়লা-আবর্জনা নিদিষ্ট স্থানে ফেলে নিজে নিজেকে বাহবা দেওয়ার চেষ্টা করি।অন্যকেও উৎসাহ দি এ বিষয়ে।
Source: Säbbîr Hossain <Travelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment

Shares