শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং

বুঝি বাতাসে তার মধুর ছোঁয়া পাই..”(বাকিটুকু মনে মনে গুণগুনিয়ে গাইতে ভালোবাসি আমি)
শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যেতে শুকনা পেরিয়ে যখন দুটি পথ মিরিক আর দার্জিলিং দিকে ভাগ হয়ে যায়, সেই সময়ে দূরে আকাশের সাথে মিশে যাওয়া সবুজ পাহাড়ের বিশাল ছাঁদে চোখ পড়লে অথবা শিলিগুড়ি থেকে কালিম্পং যেতে সেভক রোড শেষ করে যেই না গাড়ি স্রোতস্বিনী তিস্তার পাশ দিয়ে, পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথে ঢেউ খেলে খেলে চলতে শুরু করে, সর্বকালের অন্যতম জনপ্রিয় গানের এই কলি আমার মনের মধ্যে অজান্তেই বেজে ওঠে, সব সময়, সব সময়।
আমি তখন সিটের সাথে হেলান দিয়ে বসে, মাথাটা জানালার সাথে লাগিয়ে, চোখ দুটো পলকহীন রেখে মন্ত্র মুগ্ধের মত কখনো পাহাড়, কখনো অরণ্য, কখনো বয়ে চলা পাহাড়ি নদী আবার কখনো আমার প্রিয় সবুজের সমুদ্র চা বাগানের বিস্তীর্ণ সবুজের দিকে তাকিয়ে থেকে এই গান গুণগুণ করি নিজের সাথে, মনের একান্ত আনন্দে আর আমার সব সময়ের প্রেয়সীকে পেয়ে যাচ্ছি এই সুখের ভাবনা ভেবে।

কিন্তু এবার আমি প্রেয়সী দার্জিলিং বা কালিম্পং যাচ্ছিলাম না। এবার আমার যাত্রা ছিল একদমই নতুন একটি প্রদেশ, এতোদিন আমাদের জন্য নিষিদ্ধর পরে সম্প্রতি উন্মুক্ত হওয়া সিকিমের দিকে। কিন্তু সেথায় যাওয়ার পথও ছিল সেভক রোড হয়ে কালিম্পং এর দিকে যাওয়ার পথই প্রাথমিকভাবে। আর দেখা যেহেতু হয়েই গেছে সেই প্রিয় পাহাড়ি তিস্তা, সবুজ পাহাড়ের দেয়াল, পাহাড়ি ঢেউ খেলানো পথ চোখে পরতেই মনের মধ্যে প্রিয় এই গানের কলি বাজতে শুরু করেছিল। আমিও গুনগুন করছিলাম নিজের মত করে।
পাশের সুকণ্ঠি সহযাত্রী আমাকে বলল ভিউ দেখতে, পাহাড়, নদী, বাঁকানো পথের সৌন্দর্য দেখে উপভোগ করতে। তাকে সুধালাম এটা আমার ১১ তম এদিকে বা এই পথে আসা। সে কিছুটা অবাক চোখে তাকাতেই বললাম, হ্যাঁ এদিকে আমি এর আগেও দশবার এসেছি, তবে সিকিমে এই প্রথম যাচ্ছি, আমাদের জন্য আগে সিকিমের দরজা খোলা ছিলোনা বলে। সেভক থেকে তিস্তা ব্রিজ পর্যন্ত এতো বাজে, ভয়াবহ, ভাঙা, এবড়ো থেবড়ো আর ধুলোয় ধূসরিত পথ যে নিজের চোখ, মুখ ঢেকে রাখতেই হিমশিম খেতে হয় প্রতিনিয়ত। পথ, পথের বাঁক, নীল-সবুজ নদীর বয়ে চলা, সবুজ পাহাড়ি দেয়াল, ঝলমলে নীল আকাশে সাদা মেঘেদের উড়ে উড়ে চলা আর উপভোগ করা হয়ে ওঠেনা। তাই কোন রকমে চোখ মুখ বুজে সিটিয়ে ছিলাম সেভকের পরে পথের এই হাল শুরু হতেই।

তবে তিস্তা পেরিয়ে কালিম্পং এর পাশ ঘেঁসে সিকিমের দিকে যেতেই আবার উপভোগ করার মত পথ পেয়ে গিয়েছিলাম। তিস্তাকে এর আগে তো বহুবার দেখেছি, কিন্তু সিকিম যাওয়ার পথে যেভাবে, যতরূপে, আঁকাবাঁকা পথে, সমতলে বা গভীরে, নীল সবুজ রঙে সেজে থাকা তিস্তাকে এর আগে এভাবে দেখিনি কোথাও। কি যে অদ্ভুত সুন্দর লাগছিল খোলা জানালা দিয়ে পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে বয়ে চলা তিস্তার নানা রকমের রূপ দেখতে।

কখনো নীলাভ তিস্তা পাহাড়ের সাথে মিলেমিশে গেছে দূর আকাশে সাথে, কখনো সবুজাভ তিস্তার জল বুঝি থামকে আছে অন্য কোন কারনে, কখনো পাহাড় থেকে গড়িয়ে পরা আর তিস্তার প্রমত্ত জলের তোড়ে ভেসে আসা বিশাল বিশাল পাথরের সাথে বাঁধা পেয়ে উচ্ছ্বসিত হাসিতে ঝকঝকে সাদা ফেনায় ভরিয়ে তুলেছে নিজেকে আর যেখানে তিস্তা বেশ প্রশস্ত, জলের স্রোতও বেশ অনেকটা সেখানে দেখা গেছে কত রঙ বেরঙের রাফটিং বোটের ভেসে চলা তিস্তার বুকের উপরে।

এসব দেখছিলাম আর মনে মনে একটু আফসোস করছিলাম, সিটটা জানালার কাছে হলনা বলে। একটা ছবিও তুলতে পারলামনা এমন অপরূপ তিস্তার নানা রঙে সেজে থাকার। কিন্তু পরক্ষনেই মনকে বোঝালাম, যেতেই যদি না পারতাম আজ, তবে তো দেখতেও পারতামনা এমন অপরূপ রূপের তিস্তাকে, পাহাড়কে আর জানতেও পারতামনা কি আছে সিকিমে যাওয়ার পথে পথে, বাঁকে বাঁকে। তাই যেতে পারছি, দেখতে পারছি, নিজের মত করে উপভোগ করতে পারছি এটাই বা কম কিসে? পুরোটা পথ এমন একাকী আনন্দে আনন্দিত হতে হতে সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে পৌঁছে আরও বেশী অবাক হয়ে গেছি এখানকার মানুষজন, লোকালয়, দোকানপাট আর নানা রকম মানুষের সাথে গাড়িতে যেতে যেতেই মিশে মিশে।
যে অবাক করাটা আরও বেড়ে গিয়েছিল এমজি মার্গ পৌঁছে গিয়ে। আমি ভেবেছিলাম মল রোড হলেও নিশ্চয়ই দার্জিলিং, সিমলা, মানালি, লেহ, মশৌরীর মত অতটা জাঁকালো হবেনা সিকিমের মল রোড। একটু চুপচাপ, নীরব, অল্প দোকানপাট, খুব কম মানুষ আর একটু গ্রাম্য পরিবেশ থাকবে হয়তো! কি কারনে আমার মনের মধ্যে এমন ছবি আঁকা হয়েছিল আমি ঠিক জানিনা। তবে স্বীকার করছি যে সিকিমের এমজি মার্গ বা মল রোড প্রথম দর্শনেই আমার ভাবনাকে চুরমার করে দিয়েছিল মুহূর্তেই। নিজেই নিজের এমন মূর্খ ভাবনার জন্য অবাক হয়ে গেলাম। কি ভেবেছিলাম আর কি দেখছি…

চারদিকে ঝলমলে আলোয় আলোকিত, স্বচ্ছ পাথরের বাঁধানো পথে শত শত মানুষের হাসিখুশি আর কোলাহলরত মুখচ্ছবি, চারদিকে খুসির আমেজ, পথের মাঝে সবুজের ঝুলে থাকা, নানা রঙের ফুলের হাসি আর তার দুইপাশে রয়েছে বসার জন্য কাঠের নানা রঙের বেঞ্চি। কিন্তু হাঁয় একটাতেও বসার যায়গা নেই। প্রতিটা বেঞ্চিতে বন্ধু বা পরিবার নিয়ে বসে আছে কেউ না কেউ। বসার কোন যায়গা না পেয়ে আর শরীরও বেশ ক্লান্ত সারাদিন আর আগের রাত জার্নি করে। তাই ভাবলাম, আগে রুম নিয়ে নেই। ব্যাগপত্র রাখি, একটু ফ্রেস হয়ে বিশ্রাম নিয়ে তারপর না হয় সময় নিয়ে হেটে বেড়াতে আর বসে থাকতে আসবো এখানে।
ঝটপট একটা হোটেলে ঢুকে গেলাম একদম এমজি মার্গের প্রথম বাঁকের কাছেই। যেখানে রুম দেখেই পছন্দ করে ফেলেছিলাম কিন্তু দাম দেখে প্রথমে রাজী না হয়ে আর একটু দেখে নিতে চাইতে আবারো পথে বেরিয়ে পড়লাম। উফ, ততক্ষণে বেশ শীত পরে গেছে। বেশ ঠাণ্ডা লাগছে দেখে আর কোথাও না দেখে প্রথম দেখা রুমই নিয়ে নিলাম একটু দামী হলেও। যেটা পরে মনকে দিয়েছিল দারুণ তৃপ্তি, রাতে, ভোঁরে আর সকালের মিষ্টি রোদে…
যা দেখে দেখে মনের আনন্দের গেয়ে উঠেছিলাম প্রিয় এই গানের কলি…
“আজ খুসির সীমানায়,
বুঝি বাতাসে তার মধুর ছোঁয়া পাই…”

ভ্রমণ হোক বা কোথাও যাওয়া, পথে, পাহাড়ে, অরণ্যে, নদীতে বা জলাশয়ে আমরা যেন আমাদের উচ্ছিষ্ট না ফেলি

Source:  Sajol Zahid‎<Travelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment