সিটি অব ডেসটিনি বা ভিশাখাপত্তম ভ্রমণে যেভাবে যাবেন ও খরচাবলি

অাপনি যদি, সাগর, পাহাড় অার অাধুনিতার সংমিশ্রণে অসাধারণ কোন স্থান পরিদর্শণ করতে চান, তাহলে অবশ্যই অবশ্যই অাপনি বেচে নিতে পারেন ভিশাখাপত্তমকে। কেন? তাহলে জেনে নিতে পারেন অতি চমৎকার এই স্থান সম্পর্কেঃ

ভিশাখাপত্তনম, যার ডাক নাম ভাইজ্যাগ। যাকে অাবার ‘সিটি অফ ডেসটিনি’ বলা হয়। পুরান অনুসারে কার্তিক ঠাকুরের অস্ত্রের নাম অনুসারে নাকি এই শহরের নামকরণ। অার তেলেগু শব্দ পত্তনম-এর অর্থ হচ্ছে শহর (সূত্রঃঅামাদের টেক্সি ড্রাইভার)। পাহাড় ও সমুদ্রের মেলবন্ধনে তৈরি অন্ধ্রপ্রদেশের এই সাজানো শহরকে দক্ষিনের ‘নৈস্বর্গ’ বললেও হয়ত ভুল হবে না। এই শহরের অন্যতম আকর্ষণ হলো এটির একদিকে আছে পাহাড় আর অন্য দিকে সমুদ্র। অর্থাৎ উত্তরে পূর্বঘাট পর্বতমালা আর দক্ষিনে বঙ্গোপসাগর বন্ধু হয়েছে এখানে।অন্ধ্রপ্রদেশের এই বহু পুরনো বন্দর শহরটি পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার দিক থেকে অামার দেখা ভারতের অন্যান্য শহরের তুলনায় অনেকটাই এগিয়ে। পাহাড়-সমুদ্র একাকার হয়ে এক অবিশ্বাস্য মধুর কম্বিনেশন দিয়ে সাজিয়ে তুলেছে ভিশাখাপত্তনমকে৷ সেখানে না গেলে অার এর সৌন্দর্য উপভোগ না করলে হয়তো কেউ জানতেই পারবেন না কেন একে ‘সিটি অফ ডেসটিনি’ও বলা হয়।

ভিশাখাপত্তনমে প্রধান অাকর্ষণ গুলো ২ ভাগে বিভক্ত। এক দিকে হচ্ছে পাহাড়ী এখাকার দর্শণীয় স্থান। অার অপর দিকে হচ্ছে সমুদ্রের তীরবর্তী দর্শণীয় স্থান। সমুদ্রের তীরবর্তী দর্শণীয় স্থানের মধ্যে অন্যতম এখানকার অসাধারণ সুন্দর সৈকত সমুহ এবং পার্শবর্তী কিছু নজরকাড়া পর্যটনকেন্দ্র। এখানে সমুদ্রের দুটি রুপের সঙ্গে পরিচয় ঘটে পর্যটকদের। এর একটা হচ্ছে লাগাম ছাড়া, দুরন্ত, খ্যাপা। যার উত্তাল গর্জণে সরব থাকে গোটা উপকুল ও তার অাশপাশের এলাকা। অার অন্যটি স্নিগ্ধ, শান্ত অার অসীম নীল। অকুল সমুদ্রের যে দিকেই চোখ পড়বে, শুধুই নীল অার নীল৷ মনে হবে কেউ যেন চোখে স্বপ্নের রং লাগিয়ে দিয়ে গেছে৷
এখানকার সাগর পাড়ে বসে পরিস্কার নীল জলের মস্ত বড় বড় ঢেউয়ের পাথরের উপর আছড়ে পড়ার দৃশ্য, সমুদ্রের অবিরাম গর্জণ অার পাগল করে দেয়া সৌন্দর্য নিমিষেই যে কারো মনেই এনে দেবে গভীর প্রশান্তি।

তাই তো সেই স্বাদ নিতে প্রতিদিন বিকেলেই এখানকার সৈকত গুলোতে হাজার হাজার সৌন্দর্য পিপাসুদের ঢল নামে। এখানে সমুদ্র সৈকত ও তার পাশ ঘেঁষে বয়ে চলা প্রশস্থ ও দৃষ্টিনন্দন রাস্তার দুই দিকে রয়েছে বেশ কিছু পার্ক ও মিউজিয়াম। যার মধ্যে রয়েছেঃ কয়লাস গিড়ি পাহাড়, ইন্দিরা গান্ধী জিওলজিক্যাল পার্ক, ঋষিকুন্ডা সৈকত, থোটলকুন্ডা সৈকত, ভিমলি সৈকত, ভিএমঅারডিএ পার্ক, এয়ারক্রাফ্ট মিউজিয়াম, সাবমেরিন মিউজিয়াম, রামকৃষ্ণ সৈকত, ইয়ারাদা সৈকত, ডলফিন নোজ লাইট হাউজ, সাগর দর্গা মন্দির, ভিউ পয়েন্ট ইত্যাদি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি সৈকত অবস্থান হচ্ছে শহরের প্রান্ত ঘেঁষে। অার কয়েকটির অবস্থান শহর থেকে পূর্ব-পশ্চিম দুই দিকে, বেশ দূরবর্তী স্থানে। অার দূরবর্তী সেই সৈকত গুলোতে যেতে চোখে পড়ে সারি সারি নারকেল অার তাল গাছ। ঋষিকুন্ডা সৈকত থেকে ভিমলি সৈকত অবধি সমুদ্রকে সঙ্গে করে ৩০ কি. মি. রাস্তা অামাদের শুধুই দেখতে দেখতে কেটে গেল। সৈকতটি যতনা ভালো লেগেছে তার চেয়ে অনেক বেশি উপভোগ্য ছিল যাবার পথটুকু। অার শহরের প্রান্ত থেকে ইয়াদা সৈকত পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার রাস্তায়ও চোখে পড়বে অসংখ্য তাল গাছ ও নারিকেল গাছ। এমনকি এই পথে দুয়েকটি পাহাড়েও তাল অার নারিকেল গাছ ছাড়া অন্য কোন গাছ চোখেই পড়েনি। এত তাল অার নারিকেল গাছ কোথাও এর অাগে দেখিনি। সমুদ্রের সাথে নিবিড়তা বাড়ানোর আদর্শ জায়গা এই নারকেল গাছ ঘেরা ইয়ারাদা সৈকতটি অন্যান্য বীচের তুলনায় অনেক নির্জণ। একটি পার্ক লাগুয়া পরিচ্ছন্ন সৈকতটি সারাদিন অলস সময় কাটানোর অাদর্শ জায়গা। পার্ক ঘেঁষা শ্বেত বালির চর, নীল উত্তাল জলরাশি, পাহাড়, স্বচ্ছ আকাশ আর সু-উচ্চ তাল-নারকেল গাছের নানান ভঙ্গিমা, সব মিলিয়ে অাপনার চোখ ও মন ভরিয়ে দেবে, চিত্তকে প্রশান্ত করে দেবে।

সেখান থেকে ১ কিলোমিটার দূরত্বেই রয়েছে ডলফিন নোজ লাইট হাউজ। যেখানে অাপনি ওয়াচ টাওয়ারের উপড় থেকে সমুদ্র, সমতল অার পাহাড়ের অসাধারণ ত্রিমাত্রিক সৌন্দর্য উপভোগের চমৎকার সুযোগ পাবেন। ভিশাখাপত্তনমের আরেকটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র হল কৈলাশগিরি। সুন্দর সাজানো একটা পার্ক৷ সমুদ্র পাড়ে তার পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৬০ ফুট উঁচু পাহাড়ে অবস্থিত এই পার্কের কেন্দ্রে শুভ্র শিব-পার্বতীর মূর্তি বিরাজমান রয়েছে৷ পাহাড়ের দেহ কাটা-ছেঁড়া করে গড়ে ওঠা এই পার্কের দক্ষিন দিকের রেলিং ধরে দাঁড়ালেই পায়ের নিচে অশান্ত বঙ্গোপসাগরের ঢেউ আর গর্জন উপভোগ করা যায় অনেক উপড় থেকে দাড়িয়ে। যার অনুভূতিটা সত্যি অসাধারণ। পার্কের অারেকটি অাকর্ষণ হচ্ছে নিচ থেকে চূড়া পর্যন্ত পৌছানোর জন্য কৈশালগিরির রোপ-ওয়ে! পাহাড়ের চূড়া থেকে সমুদ্রের কোলে নেমে এসছে এই রোপ-ওয়ে৷

রামকৃষ্ণ সৈকতে গিয়ে মুগ্ধ হয়েছি বিশাল সাবমেরিন মিউজিয়াম অার তার পাশের এয়ারক্রাফ্ট মিউজিয়াম দেখে। ডাঙ্গায় তোলা সমুদ্রের তলদেশের বাসিন্দা এই কারসুরা সাবমেরিনের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে তার সকল কিছু প্রত্যক্ষ করার সযোগ হয়েছে। জানা গেছে সাবমেরিনের ভিতরটা ঠিক কীরকম হয়, অার কীভাবে সেনারা সেখানে পানির নীচে দিনের পর দিন কাটান। এমন অভিজ্ঞতা অর্জন করার সুযোগ সচরাচর মেলে না। অার রাস্তার অপর প্রান্তেই বিশ্বের সর্বাধুনিক, সবচেয়ে সুকৌশলী, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও ভারী এয়ারক্রাফ্ট টিইউ-১৪২ এর যুদ্ধ কৌশল, সকল অংশ ঘুরে দেখা এবং এর সম্পর্কে সকল তথ্য জানতে পেরেছি।
ভাইজ্যাগে নাকি পর্যটকদের অন্যতম গন্তব্য ফিশিং হারবার। যেখান থেকে জাহাজে করে মাছ ও সি-ফুড বিদেশে রপ্তানি করা হয়। বিশাখাপত্তনমের এই মৎস সংরক্ষণের বন্দরটি নাকি সমগ্র ভারতের অন্যতম বড় মৎস্য রপ্তানি কেন্দ্র। হারবারের দিকে এগোলেই দুপাশের শুকানো মাছের গন্ধের তীব্রতায় তা বেশ টের পাওয়া যায়। যে কারণে অামাদের অার সাহস হয়নি গাড়ি থেকে নামার!

ভিশাখাপত্তনমে অামাদের ভ্রমণের ২য় অংশ ছিল এখানকার পাহাড়ী এলাকার কয়েকটি দর্শণীয় স্থান পরিদর্শণ। যার ১মে ছিল অারাকু ভ্যালি। ভিশাখাপত্তনম থেকে অারাকু ভ্যালির দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। শহর ছাড়িয়ে পুরো রাস্তাটাই পূর্বঘাট পর্বতমালার ঢেউ খেলানো উপত্যকার মধ্যে দিয়ে। সেই রাস্তার সৌন্দর্য অবর্ণনীয়। টেক্সিতে করে প্রায় ৩ ঘন্টা পর পৌছায় অারাকু ভ্যালি। অারাকু ভ্যালি মুলত উপজাতীয় এলাকা। অার এখানকার প্রধান অাকর্ষণ উপজাতীয় জাদুঘর, নাম ট্রাইবাল মিউজিয়াম। পার্কের মত দারুন সাজানো-গুছানো এই জাদুঘরের উপকরণ গুলো কয়েকটি অালাদা অালাদা ঘরে প্রদর্শিত অাছে। ইট, পাথথর অার সিমেন্ট দিয়ে তৈরী এই ঘর গুলো দেখতে অনেকটাই মাটির ঘরের মত। যা বাইরে থেকে দেখতে অনেকটা ট্রাইবালদের কুঁড়ে ঘরের মতোই। অার ভেতরে উপজাতীদের নানান ট্রাইবাল আর্ট দিয়ে সাজানো। এই জাদুঘরটি সত্যিই অসাধারণ। মডেল করে আদিবাসীদের জীবনযাত্রা উপস্থাপন করা হয়েছে এখানে। যা দেখে খুব সহজেই ধারণা পাওয়া যায় আদিবাসীদের শিল্প-সংস্কৃতি, জীবন-যাত্রা, সমাজ ব্যবস্থা, খাওয়া-দাওয়া, পোশাক-পরিচ্ছদ, অস্ত্রশস্ত্র, অলঙ্কার, বাদ্যযন্ত্র প্রভৃতি সমন্ধে। শতকের পর শতক ধরেও নাকি তাদের সংস্কৃতি খুব একটা বেশি পরিবর্তণ হয়নি! এই আরাকু ভ্যালিতে নাকি অনেক রকমের ট্রাইবাল জাতির বাস। সরকারি হিসেব মতেই কম কমপক্ষে ১৯ টি ট্রাইবাল জাতি বাস করে এখানে। অার এখান থেকেই কিনতে পাওয়া যায় আদিবাসীদের তৈরী হস্তশিল্প সামগ্রী ও বিভিন্ন ধরনের মশলা। মিউজিয়ামের এক পাশে রয়েছে ছোট ঝিলে বোটিং এর ব্যবস্থা। অারাকু ভ্যালিতে অারো রয়েছে দৃষ্টিনন্দন দুটি পার্ক এবং দুটি প্রাকৃতিক ঝর্ণা।

অারাকু ভ্যালি থেকে অারো ৩০ কিলোমিটারের পথ বোররা কেভ বা গুহা। পাহাড়ের পর পাহাড় ডিঙিয়ে যখন বোররা গুহায় পৌঁছালালাম তখন বুঝলাম এত পথ পাড়ি দিয়ে হাজার হাজার মানুষ এখানে কেন অাসেন। লক্ষাধিক বছরের পুরনো চুনা পাথরের এই গুহায় অদ্ভুত সব প্রাকৃতিক ভাস্কর্য! পাথুরে প্রাকৃতিক স্থাপত্যে এই গুহার যে কী অপরূপ সৌন্দর্য তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। প্রায় ২০০ বছরের বেশি সময় অাগে ১৮০৭ সালে ব্রিটিশ জিওলজিস্ট উইলিয়াম কিং অাবিষ্কার করেছিলেন এই বোরা বা বোররা গুহা। প্রায় ১০০০ ফুট বিস্তৃত আর ২৭০ ফুট গভীর এই গুহায় কম করে ৪ শতাধিক সিঁড়ি আছে ঘুরে ফিরে দেখার জন্য। অার অন্ধকার এই গুহাটটি অবশ্য সুন্দর করে আলোকিত করা আছে টুরিস্টদের জন্য, যেন প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট নানান ভাস্কর্য ভালো ভাবে অবলোকন করা যায়।
এদিকে ভিশাখাপত্তনম শহর থেকে তুলনামুলক কাছে, তবে ভিন্ন পথে পাহাড়ী এলাকায় ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী অারেকটি দৃষ্টিনন্দন পর্যটন কেন্দ্র হচ্ছে সিমলাচলম এলাকার সিমহাচলম মন্দির। কলিঙ্গ স্থাপত্যশৈলীতে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল একাদশ শতাব্দীতে৷ ভিশাখাপত্তনম বা ভাইজ্যাগের অন্ততম প্রধান দর্শণীয় স্থান এটি৷ দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন এই মন্দিরটি ব্যাপক জনপ্রিয় এর অসাধারণ কারুকার্যের জন্য৷ তবে দক্ষিন ভারতের অন্যান্য মন্দিরের মতই এর ভেতরেও ছবি তোলা নিষেধ!

যারা কম খরচে ভিশাখাপত্তম ভ্রমণ করতে চান, তারা দুই ভাবে সেখানে যেতে পারেন। প্রথমত কোলকাতা বা অাগরতলা থেকে বিমানে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই ৩০-৩৫ দিন অাগে টিকেট কেটে রাখলে খরচ প্রায় অর্ধেক হয়ে যাবে। অর্থাৎ কোলকাতা থেকে বিমান ভাড়া পরবে ২০০০-২৫০০ হাজার রুপি। অার দ্বিতীয়ত কোলকাতা থেকে ট্রেণে। সেক্ষেত্রে ক্লাস ভেদে ১০০০ রুপি থেকে হাজার থেকে শুরু। অার থাকার জন্য হোটেল ভাড়া ১০০০ রুপি থেকে শুরু। খাবার খরচ অামাদের দেশের মতই। কিন্তু সাদা ভাতের দাম একটু বেশি। তবে বিরিয়ানি সেখানে বেশ সস্তা। অার নাস্তাতে খেতে পারেন ঢুসা। তাতে কিছুটা ব্যতিক্রমতাও থাকল অার খেতেও সুস্বাদু। দাম পরবে ২০-৪০ রুপি। সেখানে ঘুরাফেরার জন্য খরচ কমনোর জন্য অাপনি বেচে নিতে পারেন অটো সি এন জি, খরচ পরবে ১০০০-১২০০ রুপি। অার টেক্সি নিলে সেক্ষেত্রে খরচ পরবে ১৮০০-২০০০ রুপি। তবে অারাকু ভ্যালি অার বোররা ক্যাভের দুরত্ব বেশি বলে ভাড়া ২৫০০-২৮০০ রুপি।
Source:Mohammad Al-amin‎ <Travellers Of Bangladesh

 

Share:

Leave a Comment

Shares