সেন্টমার্টিন এবং ট্রলার ভ্রমন

অনেক দিন থেকেই ইচ্ছা ছিলো অফ সিজনে ট্রলার এ করে নারিকেল জিঞ্জিরা যাব। প্লান করার সময় অনেক জন থাকলেও শেষে আইসা লোক সংখ্যা ব্যাস্তানুপাতিক হারে কমতে থাকে। আমার এই ট্যুরের বেলায় ও তাই হয়েছে।শনিবার রাতে শ্যামলী বাস এ করে টেকনাফ এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সকাল ৭ টাই উখিয়া পৌছে যায়৷ আমাদের টিকট কাটা ছিলো টেকনাফ অব্দি কিন্তু কাউন্টার এর লোক ভুল করে উখিয়ার গাড়িতে আমাদের টিকিট দেই। পরে যখন সুপারভাইজার বলল এর পর আর বাস যাবে না, তখন টিকিট দেখানোর পর তার নিজেরাই আমাদের লোকাল বাসে উঠায়া দেই।

লোকাল বাসে করে যাচ্ছি টেকনাফ বাস স্ট্যান্ড। চারদিকে ধ্বংশ হওয়া পাহাড় আর রোহিংগা ক্যাম্প৷।
১০ টার দিকে গিয়ে পৌছায় টেকনাফ বাস স্ট্যান্ড এ৷ সেখান থেকে অটো রিক্সায় করে চলে গেলাম ট্রলার ঘাট এ।অনেক গুলা গ্রুপ ছিলো সেদিন। ২২০ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে নাস্তা করতে গেলাম বাজার দিকে।।

ভাটার কারনে ট্রলার ১১.৩০ এর পরে যাত্রা শুরু করে।অনেক পোষ্ট এ দেখেছি ট্রলার এ গেলে নাকি সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ এ ভয় লাগে।খালি পেটে যেতে, এই ভয়ে কম খাইছি সকাল বেলা। বাট আজ সমুদ্র শান্ত থাকায় কোন রকম রোলার কোস্টার এর অনুভূতি পাইলাম না।সমুদ্র এখন নদীর মত শান্ত৷

চারদিকে নীল পানি, যেদিকে তাকাই সেদিকেই নীল পানি।ভাগ্যক্রমে একটা ডলফিন দেখেছি , যদিও আমি শিউর না সেইটা ডলফিন কিনা !!!! তবে স্থানীয় যারা ছিলেন তাদের মতে এইটা ডলফিন ই!

দুপুর ২ টা নাগাদ জেটি তে পৌছে খাওয়া দাওয়া করে নিলাম।।ভাত একে ত আতপ চাউল তার উপর শক্ত।
আগে থেকেই রিসোর্ট এ রুম বুকড করা ছিলো।ড্রীম নাইট রিসোর্ট এ৷ পশ্চিম বীচ এ অবস্থিত এই রিসোর্ট।।অসম্ভব সুন্দর গোছানো।

৷ ভাগ্যক্রমে বগুড়ার ৩ ভাইকে পেয়ে গেছিলাম যদিও আগে থেকেই নিয়াজ মোর্শেদ ভাই প্রশ্ন ফাস করে দিয়েছিলো সেখানে নাকি নোমান ভাই আছেন।।।পুরো রিসোর্ট এ আমরা সবাই বগুড়ার। আলাদা একটা ব্যাপার।

রিসোর্ট এর পাশেই এক বাসায় ঢুকে গেলাম সালাম দিয়ে।এক পিচ্চির সাথে বেশ খাতির হলো, তার বাসায় প্রচুর ডাব গাছ। বললাম, গাছ থেকে ডাব পাইরা দিলে ডাব খাব।২৫ টাকা করে ডাব খেলাম এবং আরও ১০ টা রুমে নিয়ে রেখে দিলাম।।সেন্টমার্টিন এ আইসা ডাব না খেলে হবে!!!!
পিচ্চির ভাষ্যমতে, আমাকে তার ভালো লেগেছে, তাই কচি ডাব বিক্রি করতেছে।। এই ডাব সিজন ওর জন্য রিজার্ভ করে রাখতেছে।।এখন কেউ চাইলে তাকে নারিকেল ওয়াকা ডাব দিচ্ছে।

রিসোর্ট এর হ্যামক এ বসে দোল খেতে খেতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।সন্ধ্যার আকাশ আরও ভয়ংকর সুন্দর।

সন্ধ্যা ৭ টাই আমরা বগড়ার ছোলপোল সবাই মিলে বাজারে গেলাম।সাইকেল ভাড়া নিলাম ২০ টাকা দিয়ে। বাজারের মোড়ে একটা ভাজাপোড়ার দোকানের সিংগারা টা অনেক টেস্ট৷ রাতের খাবারের জন্য মুরগি কিনে আবার সাইকেলে করে রওনা দিলাম রিসোর্টে।

রাতে বড় ভাইদের ট্রিট ছিলো।হায়দার ভাই রিসোর্ট এর ম্যানেজার। রাতের রান্নাতে প্রচন্ড পরিমান ঝাল দিয়েছে যাতে আমরা কেউ খেতে না পারি।

খাওয়া শেষে সবাই বসে আড্ডা দিলাম।নোম্ন ভাই এর কাছে আপদার ছিলো আমার একটা ছবি তুলে দিতে হবে মিল্কি ওয়ে সহ।। আমাদের সৌভাগ্য ছিলো সেদিন আকাশ ভরা ছিলো তার আর মিল্কিওয়ে।। আকাশ থেকে তারা ছিটকে পড়ার দৃশ্য ছিলো মনে রাখার মত। নোমান ভাই এস্ট্রোলজি নিয়েই ভালো খোজ খবর রাখেন।

রাত ৩ টা অব্দি পশ্চিম বীচ ধরে আমরা বগুড়ার ছোলপোল ঘুরে বেড়ালাম সারা দ্বীপ৷ পায়েল ভাই অবশ্য ভয় পেয়ে রুমে চলে গিয়েছিলো। পশ্চিম বীচ এর শেষ দিকে হুমায়ুন স্যার এর রিসোর্ট এর এদিকে নাকি মাথা কাটা ৬ টা লাশ পেয়েছিলো কিছুদিন আগে।এই ভয়ে পায়েল ভাই আমাদের আর যেতে দিলো না।

তারপর হ্যামক এই রাতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।সকালে উঠে চোখ খুলেই দেখি সমুদ্রের বিশাল গর্জন।।
নোমান ভাইরা আজ চলে যাওয়াতে একা লাগছিলো অনেকটা। সকাল ১০ টার দিকে বাজারে গিয়ে সাইকেল ভাড়া নিয়ে প্রচন্ড রোদের মধ্যে ঘুরে বেরালাম বীচ ধরে।।ইচ্ছা ছিলো ছেড়াদ্বীপ যাব। কিন্তু রোদের তাপে আর ইচ্ছা হলো না। ফিরে চলে আসলাম৷ সেন্টমার্টিন এ প্রচন্ড রোদ।। তাই ফুল হাতা কাপড় নিয়ে যাওয়া উত্তম।

সারাদিন ঘুরে বাজারে দুপুরের খাবার খেয়ে রিসোর্ট এ চলে গেলাম।রিসোর্ট এর হ্যামক এ দোল খেয়ে সন্ধ্যা নামিয়ে ফেললাম।।আজকেও ছেড়াদ্বীপ এ যাওয়া হলো না প্রচন্ড রোদের কারনে।।আগামীকাল সকালে ব্যাক করব ঢাকা। তাই ভোর সকালে ছেড়াদ্বীপ যাওয়ার প্লান করলাম।।
রাতে বীচ ধরে হাটলাম।।। আরও দুই একটা গ্রুপ উঠেছিলো।তাদের কর্মকান্ডে বিরক্ত হয়েছি আমি বলা যায়। ব্লুটুথ স্পিকার নিয়ে গান শোনার জন্য কি সেন্টমার্টিন আসে তারা? নাকি নির্জনতা অনুভব করতে আসে সেন্টমার্টিন এ আমার বোধগম্য হলো না।।বীচ অনেক ক্লিন।কিছুদিন আগে টিওবি ভাই ব্রাদার রা ৫৫৫ কেজি প্লাস্টিক কুড়ায়া নিয়ে গেছে।। এর পরেও প্রতিন্দিন আমরা ময়লা করছি এই দ্বীপ।।

রাতের সেন্টমার্টিন একটু আলাদা। চারদিকে নিস্তব্ধতা আর সমুদ্রের পাড়ে পানি আছড়ে পড়ার আওয়াজ।রিসোর্ট বাজার থেকে বেশ দূরে হওয়ায় বাজারে যেতে বিরক্তই লাগে বলা চলে।।।তবে মাছ ধরা নিষেধ থাকার কোন বার্বিকিউ করতে পারি নাই মাছ দিয়ে।।।বরশি দিয়ে অনেকে মাছ ধরে বিক্রি করলেও তার দাম অনেক হাকাচ্ছে।
বাজারে খাবার প্যাকেজ সিস্টেম। মুরগী, মাছ, ডিম এই সিস্টেম। খাবার দাম বেশি রাখার কারন ও তারা বলেছে, তাদের সব কিছু টেকনাফ থেকে নিয়ে আসা লাগে।ডাব আর মাছ বাদে সবই তাদের টেকনাফ থেকে আনা লাগে৷

আমরা রিসোর্টেই খাওয়া দাওয়া করি।।এই কয়েক দিনে প্রচুর ডাব খেয়েছি। পানি লবনাক্ত হওয়ায় ডাবের উপর ই চাপ গেছে।

পরদিন সকাল বেলা ৫.৩০ এ ছেড়াদ্বীপ এর জন্য পশ্চিম বীচ ধরে হাটা শুরু করি।হেটেই ছেড়াদ্বীপ যাওয়ার প্লান ছিলো।।সমুদ্রের পাড় ধরে হেটে হেটে যেতে থাকি।সেন্টমার্টিন এ প্রচুর কুকুর। আমাদের সাথে সকাল ৫.৩০ এ একটা কুকুর ছেড়াদ্বীপ গেছে।পুরো রাস্তা আমাদের সাথে গিয়েছে।পুরো সেন্টমার্টিন হেটেই দেখেছি।।

ছেড়াদ্বীপ এর কাছে একটি পরিবার বসবাস করে।তারা ডাব, দুপুরের খাবার বিক্রি করে।আমার খুব হিংসে হয়েছে তাদের দেখে৷ পুরো একটা নির্জন দ্বীপ এ একাই বসবাস তাদের। কোন ভয় নেই, কি জীবন।

ছেড়াদ্বীপ অন্য রকম সুন্দর একটা জায়গা। চারদিকে প্রবাল আর প্রবাল।পুরো সেন্টমার্টিন টাই আসলে প্রবাল এ ভরা।বাংলাদেশ এর একমাত্র প্রবাল দ্বীপ এটি।ছেড়াদ্বীপ এ আমার ইচ্ছা ছিলো প্লাস্টিক এর বোতল কুড়াব কিন্তু আগের দিন বিকালে যেতে না পারায়া আজ সময় কম থাকায় করতে পারলাম না।আন্তরিক ভাবে দুঃখিত নিয়াজ মোর্শেদ ভাই ৪.৩০ ঘন্টা হাটাহাটি করে আবার পৌছে গেলাম রিসোর্ট এ, সাথে সেই কুকুর টা।। রিসোর্টে যেতে যেতে ১০ টার মত বাজায় সেদিনের ট্রলার মিস করি।বাধ্য হয়ে আরেকদিন থাকা লাগে।

সেদিন সারাদিন আমি ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিয়েছিলাম।আর রায়হান ভাই একা একাই মাছ ধরতে চলে গেছে জেটির কাছে।ভাই এর মাছ আর কপাল্ব জুটল না। রাত ১১ টা অব্দি ভাই জেটিতে ট্রাই করল মাছ ধরার কিন্তু একবার মাছ ধরা দিয়েও ধরা দিলো না ভাই এর কাছে।আফসুস।

পরদিন সকালে দ্রুত ঘুম থেকে উঠে গেলাম। আগের রাতেই বলে রেখেছিলাম খিচুড়ি রান্না করতে। সমুদ্রের পাড়ে বসে সকাল বেলা খিচুড়ি আর ডিম দিয়ে ব্রেকফাস্ট। আহা!!.শান্তি । মাত্র ৮০ টাকা দিয়ে ভরপেট খিচুড়ি।

সকালে বাজারে গিয়ে মেম্বার হাবিব ভাই ওর সাথে অনেক ক্ষন আড্ডা দিলাম। অসম্ভব ভালো একজন লোক মনে হলো কথাবার্তায়৷ চা এর দাওয়াত গ্রহন করে এক সাথে চা আর আড্ডা চলল।ভাই বিভিন্ন সমস্য নিয়ে আলোচনা করলেন আমাদের সাথে। সেন্টমার্টিন এ কোন ডাক্তার নেই।নামে ডাক্তার আছে তারা এখানে থাকে না।কোন সচিব/মন্ত্রী আসলে আগের দিন আসে আবার মন্ত্রী/এমপি চলে গেলে চলে যায়। ডাক্তার এবং চিকিৎসা সেবায় তারা অবহেলিত৷

হাবিব ভাই থেকে বিদায় নিলে ট্রলার এ উঠে টেকনাফ এর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।আজকেও সমুদ্র শান্ত তবে প্রচন্ড রোদ। চামড়া পুড়ে গেছে আমার রোদে।।
ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো না।মনে হচ্ছিলো আরও কয়েকটা দিন, মাস থেকে যায় এই দ্বীপ এ। সেখানে নেই কোন কোলাহল, নেই কোন পিছুটান৷

দুপুর ১ টায় টেকনাফ পৌছে গেলাম। সিএনজি নিয়ে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে চলে গেলাম কক্সবাজার। কক্সবাজার না গেলে ট্যুর অসম্পূর্ণ লাগবে আমার কাছে।।

খরচাপাতি:

ঢাকা টু টেকনাফঃ৯০০(নন এসি)
টেকনাফ টু সেন্টমার্টিন টু টেকনাফঃ২২০+২২০(ট্রলার)
রিসোর্টঃ প্রতি রাত ৮০০*৩ঃ ২৪০০ (৪ জনের রুম)
দুপুর রাত খাবার: ১৫০ প্রতি বেলা
সকাল নাস্তাঃ৫০
ডাবঃ ২৫ টাকা পিছ
টেকনাফ টু কক্সবাজারঃ২৫০ মেরিন ড্রাইভ দিয়ে
কক্সবাজার টু ঢাকাঃ ৮০০ নন এসি
সাইকেল ৩ দিনেঃ ৩০০ টাকা
ড্রীম নাইট রিসোর্ট এর নাম্বারঃ 01825656326 ( হায়দার ভাই, ম্যানেজার)

সেন্টমার্টিন এর সীজন সামনে। অনেক পর্যটক ঘুরতে যাবেন,দয়া করে প্লাস্টিক এর ব্যাপারে সচেতন হবেন আশা করি। দ্বীপ টা আমাদের সম্পদ৷ তাই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখাও আমাদের দায়িত্ব।

Source: Tofail Hridoy‎<Travelers of Bangladesh (ToB)

Share:

Leave a Comment